নিজস্ব প্রতিবেদক
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, গণমাধ্যম শিল্পকে কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখলে হবে না, এটি রাষ্ট্র ও সমাজ পুনর্গঠনের অত্যন্ত দায়িত্বশীল শিল্প। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। তাই এই শিল্পের বিকাশে নিয়ন্ত্রণের বদলে সহযোগিতামূলক সংস্কৃতি বা ‘ফ্যাসিলিটেশন’ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
গতকাল বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব এবং সম্পাদক পরিষদের যৌথ আয়োজনে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
নিউ এজ সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন নোয়াব সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ডেইলি স্টার সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহফুজ আনাম, জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি ও কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ, গণমাধ্যম সংস্থা কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন, সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। এ ছাড়াও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাটকোর মহাসচিব আব্দুস সালাম, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল প্রমুখ বক্তব্য দেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা গণমাধ্যমের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না; বরং এই শিল্পের বিকাশে আমরা একটি ‘হেলদি রেজুলেশন’ বা সুস্থ নীতিমালা তৈরি করতে চাই। প্রচলিত সরকারি কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল যুগের সমস্যা মোকাবেলায় পিছিয়ে রয়েছে। তাই সমস্যা সমাধান বা বোঝার জন্য আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।’ এ লক্ষ্যে সব অংশীজনের সমন্বয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হবে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বাধীন ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠন।
উপাত্তহীন সংবাদের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, তথ্যের স্বাধীনতা মানে যেমন খুশি তেমন প্রচার নয়। বড় বড় সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোকে উপাত্তহীন বা ধারণাভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি থেকে বিরত থাকতে হবে। তথ্যকে অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ ও ‘ক্লিন ইনফরমেশন’ হতে হবে।
মাহফুজ আনাম বলেন, যে দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা সুপ্রতিষ্ঠিত, সেখানেই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার সুরক্ষিত থাকে। সংবিধান কেবল বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যম- এ দু’টি পেশাকে বিশেষ সুরক্ষা দিয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের আত্মোপলব্ধির আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাংবাদিকতা যেন কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার না হয়। যাতে সর্বদা মানুষের অধিকার ও সমাজের স্বার্থে পরিচালিত হয়।
নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, অপতথ্যের বিস্তার বর্তমানে মহামারি আকার ধারণ করেছে। এটি রুখতে কেবল আইন নয়; বরং একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। তিনি ইউটিউব ও ফেসবুকে লাইক-ভিউ পাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধের আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে নুরুল কবির বলেন, একটি রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে যে নতুন রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, সেখানে সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারগুলোর মতো ‘দায়িত্বশীলতার’ দোহাই দিয়ে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার পুরনো সংস্কৃতি থেকে এ সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে।’ সভায় আলোচকরা গণমাধ্যমের আর্থিক সচ্ছলতা, পেশাগত উৎকর্ষতা ও নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন।
এ দিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক আলোচনা সভায়ও সভাপতির বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী। বক্তব্যে তিনি বলেন, সংবাদপত্র ও টেলিভিশন খাতের শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পত্রিকার প্রচার সংখ্যা (সার্কুলেশন) এবং টেলিভিশনের দর্শক পরিমাপের সূচক ‘টিআরপি’ নির্ধারণ পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনা হবে।
তথ্য ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনায় বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতি পরিহার করে আধুনিক ডিজিটাল মেকানিজমের মাধ্যমে সঠিক উপাত্ত (ডেটা) নিশ্চিত করা হবে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন,তথ্য ও যোগাযোগের বিজ্ঞানে উপাত্ত বা ‘ডেটা’ ছাড়া কোনো তথ্যই পূর্ণাঙ্গ নয়। বর্তমানে পত্রিকার ছাপা সংখ্যা এবং টেলিভিশনের টিআরপি নির্ধারণে যে পদ্ধতিগুলো চালু আছে, সেগুলো অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্র, সমাজ এবং অংশীজনরা এক ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। আমরা এই ডিজিটাল যুগে মেকানিজম পরিবর্তন করে একটি গ্রহণযোগ্য ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান বের করব।
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম বলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে পেশাদার সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও একটি শক্তিশালী ডেটাবেজ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম শামীম রেজা।



