অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে শুরু করেছে। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লি. (সিডিবিএল) থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে চলতি বছরের শুরু থেকে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতিও মে মাসে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। এতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে পুঁজিবাজার।
প্রতিষ্ঠানটি থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৪ মে পর্যন্ত দেশের শেয়ারবাজারে মোট বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৬৫ হাজার ৭৪১টি। এপ্রিল মাস শেষে এ সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৬১ হাজার ১২৩টি। অর্থাৎ মে মাসের প্রথম ২৪ দিনে নতুন করে যুক্ত হয়েছে চার হাজার ৬১৮টি বিও হিসাব। ঈদুল আজহার ছুটির কারণে ২৪ মে-পরবর্তী তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় ওই দিন পর্যন্ত বিও হিসাব বিবেচনা করা হয়েছে। এ সময়ে মোট ১৭ কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ২৭১টি নতুন বিও হিসাব যুক্ত হয়েছে।
অপর একটি তথ্যমতে, পুঁজিবাজারে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কয়েক মাস ধরেই বাড়ছে। বর্তমানে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব রয়েছে ১৬ লাখ চার হাজার ২৫৮টি। এপ্রিল শেষে এ সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ৭৩৮টি। চলতি বছরের শুরুতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৩টি। অর্থাৎ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ২৫ হাজার ২৩৫টি বিও হিসাব। শুধু মে মাসেই বেড়েছে চার হাজার ৫২০টি হিসাব।
মে মাসে বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবের সংখ্যাও বেড়েছে। বর্তমানে বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব রয়েছে ৪৩ হাজার ২২৮টি, যা এপ্রিল-শেষে ছিল ৪৩ হাজার ২০৪টি। অর্থাৎ এক মাসে বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের হিসাব বেড়েছে ২৪টি। এ সংখ্যা বাস্তবতার নিরিখে খুব একটা বেশি না হলেও এ ধারাবাহিকতা সামনের দিনগুলোর জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে এবং পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন ঘটায়।
বর্তমানে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব রয়েছে ১২ লাখ ৫৪ হাজার ৪১৩টি। ২০২৫ সালের শেষে এ সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৩টি। অর্থাৎ চলতি বছরে পুরুষদের বিও হিসাব বেড়েছে ২০ হাজার ৬৭০টি। এর মধ্যে শুধু মে মাসেই যোগ হয়েছে তিন হাজার ৮২৬টি হিসাব। অন্য দিকে নারী বিনিয়োগকারীদের নামে বর্তমানে বিও হিসাব রয়েছে তিন লাখ ৯৩ হাজার ৭৩টি। ২০২৫ সালের শেষে এ সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৮৮ হাজার ৮২৯টি। চলতি বছরে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে চার হাজার ২৪৪টি। এর মধ্যে মে মাসে বেড়েছে ৭১৮টি।
এ বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি কোম্পানির নামে খোলা বিও হিসাবের সংখ্যাও বেড়েছে। বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৮ হাজার ২৫৫টি, যা ২০২৫ সালের শেষে ছিল ১৭ হাজার ৮০৩টি। সে হিসাবে চলতি বছরে ৪৫২টি নতুন কোম্পানি বিও হিসাবে যুক্ত হয়েছে। শুধু মে মাসেই বেড়েছে ৭৪টি হিসাব।
বর্তমানে একক নামে পরিচালিত বিও হিসাবের সংখ্যা ১২ লাখ পাঁচ হাজার ৬৮৬টি। ২০২৫ সালের শেষে এ সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৮২ হাজার ৭১৫টি। চলতি বছরে একক বিও হিসাব বেড়েছে ২২ হাজার ৯৭১টি। এর মধ্যে মে মাসেই বেড়েছে চার হাজার ৩৭৬টি। অন্য দিকে যৌথ নামে পরিচালিত বিও হিসাব বর্তমানে রয়েছে চার লাখ ৪১ হাজার ৮০০টি। ২০২৫ সালের শেষে যার সংখ্যা ছিল চার লাখ ৩৯ হাজার ৮৫৭টি। অর্থাৎ চলতি বছরে যৌথ বিও হিসাব বেড়েছে এক হাজার ৯৪৩টি। মে মাসে নতুন যুক্ত হয়েছে ১৬৮টি যৌথ হিসাব।
পুুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক জায়গা। বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা মূল বিষয়। এই আস্থাই বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে পুঁজিবাজারে গতি আনে। এরই প্রতিফলন সম্প্রতি পুঁজিবাজারে দেখা যাচ্ছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাজারগুলো লেনদেনের একটি সম্মানজনক অবস্থান ধরে রেখেছে। এটা প্রমাণ করে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমবেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ঈদ-পরবর্তী পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা তাদের আগের পুঞ্জীভূত লোকসানের কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পাবেন।
তবে তারা সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুই হাজার কোটি টাকার কম পরিশোধিত মূলধনের ব্যাংকগুলোর নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা এ খাতটির প্রতি নতুন করে নেতিবাচক মনোভাব দেখাতে পারে যার প্রতিফলন ঘটতে পারে বাজার আচরণে। তারা এ সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি করে বলেন, এমনিতেই ব্যাংকিং খাতের দুর্বল কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ নিয়ে তারা প্রচণ্ড ঝুঁকিতে রয়েছেন। তার ওপর ভালো ব্যাংকগুলোতে করা বিনিয়োগও নতুন করে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সাথে ঈদ-পরবর্তী পুঁজিবাজার আচরণ ও তাদের প্রত্যাশা নিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, তারা ঈদের পর একটি ভালো পুঁজিবাজারের প্রত্যাশা করেন। তারা মনে করেন, আগামী বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য কেমন প্রণোদনা রাখা হয়েছে এটা এ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে বিএসইসির পুনর্গঠন। বর্তমান কমিশনের ওপর বিনিয়োগকারীদের পাশাপািশ স্টেক হোল্ডারদের একটি অংশের আস্থা নেই। বিএসইসির পুনর্গঠনের কাজটি যত তাড়াতাড়ি করা হবে তত দ্রুত আস্থা ফিরবে পুঁজিবাজারে।
এ দিকে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি শেষ হয়েছে গতকাল। দীর্ঘ বিরতির পর আজ সোমবার (১ জুন) খুলছে পুঁজিবাজারসহ সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক-বিমা প্রতিষ্ঠান। দেশের দুই পুঁজিবাজারেও আজ যথারীতি লেনদেন শুরু হচ্ছে।



