গণভোট অবৈধ হলে সংসদও অবৈধ : মিরপুরে ডা: শফিকুর রহমান

Printed Edition
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান  : নয়া দিগন্ত
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

গণভোট অবৈধ হলে সংসদ নির্বাচনও বৈধ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন, গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান, জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং আহতদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি বলেন, জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য না করে শহীদদের যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে এবং গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় রাজধানীর মিরপুর-১০ ফলপট্টিসংলগ্ন এলাকায় জামায়াতে ইসলামী, ঢাকা মহানগরী উত্তরের মিরপুর অঞ্চলের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার’- দাবিতে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা কথা দিয়েছিলাম নির্বাচনের আগে যে আমরা যদি নির্বাচিত হই প্রত্যেকটা খুনের এবং অপরাধের বিচার ইনশাআল্লাহ আমরা করব। যদি আমরা সরকার গঠন করতে পারি, এ কথা বর্তমান সরকারের দলও বলেছিল।

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জুলাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করতে শিখুন। যাদের কারণে আজকের সংসদ, আজকের সরকার, আজকের বিরোধী দল, তাদেরকে অগ্রাহ্য বা অপমান করবেন না। তাদের আত্মা অভিশাপ দেবে। শহীদদের আত্মা যদি অভিশাপ দেয়, কেউ শান্তিতে থাকতে পারবে না। অতএব, বিচারটা করুন। বিচারের দিকে মনোযোগ দিন। আপনাদেরও বহু সহকর্মী খুন হয়েছে, গুম হয়েছে, লাঞ্ছিত হয়েছে, ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছে, দফায় দফায় জেলে গিয়েছে। অন্তত নিজেদের কর্মীদের মুখের দিকে তাকিয়ে এবং গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের কথা বিবেচনা করে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলি, বিচারটা করুন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, যারা আহত, পঙ্গু হয়েছে তারা জীবন্ত শহীদ। চোখ নেই, হাত নেই, পা নেই; শরীরের ভেতরে অসংখ্য পিলেট ও বুলেট নিয়ে তারা বেঁচে আছে। কেউ ঘাড়ে, কেউ পিঠে, কেউ মেরুদণ্ডে, কেউ হাতে, কেউ পায়ে সেই ক্ষত বহন করছে। তারা রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারে না, রুজি-রোজগার করতে পারে না। তাদের যথাযথ তালিকা তৈরি করে সম্মান দিতে হবে। সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিতে হবে। তাদের চিকিৎসার জন্য সরকারকে এককভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।

শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগ ইতিহাস ও পাঠ্যপুস্তকে যথাযথভাবে স্থান দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের অবদান জানতে পারে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনার নাম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের নামে নামকরণ করা হোক, যাতে তাদের আত্মত্যাগ রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকে।

তিনি আরো বলেন, জনগণের রায়কে অবমূল্যায়ন করলে ইতিহাসে তার কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও জনগণ তাদের অধিকার আদায়ে আপসহীন থাকবে।

স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, মিরপুরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, গ্যাস ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট এবং অবৈধ সংযোগ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সংসদের ভেতরে লড়াই করে যাচ্ছি এবং বাইরেও লড়াই করে যাচ্ছি। আজকের এই আয়োজন সেই লড়াইয়ের অংশ। আমাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত, জনগণের মুক্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এবং ফ্যাসিবাদের শেষ চিহ্ন বাংলাদেশ থেকে বিদায় না নেয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন বলেন, জুলাইয়ের চেতনার মূল লক্ষ্য ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। তিনি জুলাইয়ের শহীদ পরিবারগুলোর দায়ের করা মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করা হয়েছে। তার দাবি, অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমও প্রভাবিত হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু সভা-সমাবেশ করে দাবি আদায়ের সময় শেষ; এখন কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করতে হবে। রাজধানীতে নারী, শিশু ও সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে তিনি অবিলম্বে সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান। পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে কারচুপির চেষ্টা করা হলে জনগণ কঠোর জবাব দেবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের মানুষ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। জনগণের প্রত্যাশা ছিল সরকার শাসক নয়, জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। তিনি বলেন, জনগণ ব্যাপক সমর্থন দিয়েছিল দেশ গড়ার জন্য, কিন্তু সেই সমর্থনের যথাযথ মূল্যায়ন না করে সরকার হঠকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সংস্কারের নামে একটি লোকদেখানো কমিশন গঠন করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ডা: মো: ফখরুদ্দিন মানিক সঞ্চালনা করেন। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব:) মো: আব্দুল বাতেন, মেজর (অব:) মো: আক্তারুজ্জামানসহ স্থানীয় নেতারা।