ভোটের সমীকরণে নতুন বাঁক

ফেনী-২ আসনে ধানের শীষের মাঠে উড়ছে ঈগল

Printed Edition
জয়নাল আবেদিন –বিএনপি, মজিবুর রহমান মঞ্জু-এবি পার্টি
জয়নাল আবেদিন –বিএনপি, মজিবুর রহমান মঞ্জু-এবি পার্টি

ফেনী অফিস

ফেনী পৌরসভা ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ফেনী-২ সংসদীয় আসনে এবারের নির্বাচনী মাঠে দৃশ্যমান এক ভিন্ন বাস্তবতা। দীর্ঘ দিন ধরে যেখানে নৌকা ও ধানের শীষের দ্বিমুখী লড়াই ছিল নিয়মিত চিত্র, সেখানে এবার নৌকাবিহীন নির্বাচনে নতুন প্রতীক ‘ঈগল’ সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে ধানের শীষের বিপরীতে। ফলে ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে নতুন হিসাব-নিকাশে প্রবেশ করেছে এই আসনটি।

এখানে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন, যিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ভিপি জয়নাল’ নামে অধিক পরিচিত। তার বিপরীতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, যিনি ঈগল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। এ ছাড়া আরো ১১ জন প্রার্থী এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও ভোটের মূল লড়াই এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুরুর দিকে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সাবেক জেলা আমির অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঞাকে নিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন নেতাকর্মীরা। তবে হঠাৎ করে ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তে লিয়াকত আলী ভূঞার পরিবর্তে মজিবুর রহমান মঞ্জুকে সমর্থন দেয়ায় নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। প্রাথমিকভাবে নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা মান-অভিমান ও দ্বিধা দেখা দিলেও কেন্দ্রীয় নির্দেশনার পর ধীরে ধীরে সেই জড়তা কাটতে শুরু করে। বিশেষ করে গত ৩০ জানুয়ারি আমিরে জামায়াত ডা: শফিকুর রহমানের ফেনীর জনসভায় দেয়া ভাষণের পর থেকেই ঈগল প্রতীকের পক্ষে জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা পূর্ণোদ্যমে মাঠে নামেন।

রাজনৈতিক ইতিহাসে ভিপি জয়নালের অবস্থান সুদৃঢ়। তিনি ১৯৮৮ সালে জাসদ থেকে মশাল প্রতীক নিয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়নাল হাজারী এবং সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকেও পরাজিত করে সংসদে যান। তবে বিএনপি ও জামায়াতবিহীন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টানা তিনবার এই আসনে জয় পান কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের জেলা সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী।

এবার ভিপি জয়নালকে পুনরায় ধানের শীষের মনোনয়ন দেয়া হলে জেলা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে প্রকাশ্য অসন্তোষ দেখা দেয়। জেলা আহ্বায়ক, যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব লিখিতভাবে দলের হাইকমান্ডে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানান। নেতাদের অভিযোগ, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে ভিপি জয়নালের সরাসরি মাঠপর্যায়ের ভূমিকা ছিল সীমিত; নেতাকর্মীদের আপদে-বিপদে তাকে পাওয়া যায়নি। বয়সজনিত কারণেও তিনি অনেকটা নিষ্ক্রিয়- এমন অভিযোগও ওঠে। তবে মনোনয়ন পাওয়ার পর ভিপি জয়নাল নিজে থেকেই নেতাকর্মীদের সাথে দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টা চালান।

এ দিকে নির্বাচনী প্রচারণায় সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য নিয়ে ভিপি জয়নাল নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েন। দলীয় নীতিনির্ধারকরা এখন তাকে প্রচারে ও বক্তব্যে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। তাদের দাবি, অতীতে ভিপি জয়নাল তিনবার এমপি থাকলেও ফেনীর উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেননি। ফলে এবার ভোটাররা নতুন মুখের দিকে ঝুঁকতে পারেন। বিশেষ করে নতুন ও নারী ভোটাররা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

একসময় বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ফেনীর রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। জুলাই বিপ্লবের পর আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি জনগণের নজর কাড়ে। অন্য দিকে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী চাঁদাবাজি, বালু উত্তোলন ও মামলা বাণিজ্যের অভিযোগে বিতর্কিত হন, যা দলের ভাবমর্যাদায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এ প্রেক্ষাপটে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ভোটের মাঠে নতুন মুখ হলেও জাতীয় রাজনীতিতে তিনি সুপরিচিত। গণ-অভ্যুত্থানে তার সক্রিয় ভূমিকা ভোটারদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে একসময়ের ধানের শীষের দুর্গখ্যাত ফেনীর রাজনৈতিক মাঠে এখন ঈগল প্রতীক ক্রমেই ডানা বিস্তার করে চলেছে।

তবে রাজনীতির পুরনো খেলোয়াড় ভিপি জয়নালও শেষ পর্যন্ত লড়াই ছাড়ছেন না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আরেকটি বিজয়ের আশায় তিনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ আসনে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ একরামুল হক ভূঞা (হাতপাখা), জেএসডির সামছুদ্দিন মজুমদার (তারা), খেলাফত মজলিসের হারুনুর রশিদ ভূঞা (রিকশা), বাসদের জসিম উদ্দিন (কাঁচি), গণ অধিকার পরিষদের তারিকুল ইসলাম ভূঞা (ট্রাক) প্রমুখ। অপর প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মোহাম্মদ আবুল হোসেন (বটগাছ), ইনসানিয়াত বিপ্লবের তাহিরুল ইসলাম (আপেল), আমজনতা দলের সাইফুল করিম মজুমদার (প্রজাপতি), স্বতন্ত্র প্রার্থী মো: ইসমাঈলের (ঘোড়া) দেখা মেলেনি ভোটের মাঠে। তাদের তৎপরতা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে।

ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, সব মান-অভিমান ভুলে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন। আমরা আশাবাদী, রেকর্ড ভোটে বিএনপি জয়ী হবে।

অন্য দিকে জেলা জামায়াতের আমির মুফতি আবদুল হান্নান জানান, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মজিবুর রহমান মঞ্জুর ঈগল প্রতীকের পক্ষে সর্বাত্মকভাবে কাজ করছেন তারা। তার ভাষ্য, নিশ্চয়ই এবার ভোটাররা প্রতীক নয়, যোগ্যতা ও দক্ষতা বিবেচনায় ভোট দেবেন।

জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ফেনী-২ আসনে একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়নে মোট ১৪৬টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। মোট ভোটার চার লাখ ৩৭ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ২৫ হাজার ৮৮১ জন, নারী ভোটার দুই লাখ ১১ হাজার ১৯৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন।