বাজেট থাকলেও উন্নয়ন হযবরল জনপ্রতিনিধিহীন স্থানীয় সরকার

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

  • বরাদ্দ ও বাজেট থাকলেও বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না
  • কোথাও কোথাও প্রশাসক, সরকারি কর্মকর্তারা দায়িত্বে
  • জনপ্রতিনিধি না থাকলেও ৯০০ কোটি টাকা বাড়তি বরাদ্দ পেল
  • বেশির ভাগ পৌরসভায় হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় হার ৫০ শতাংশেরও নিচে

জেলা পরিষদের বড় অংশ ও সিটি করপোরেশন ছাড়া দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিশূন্য। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে স্থানীয় সরকারের কাজে অচলাবস্থা নেমে এসেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কোথাও প্রশাসক, কোথাও সরকারি কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। উন্নয়নকার্যক্রমগুলো এখন ঝিমিয়ে পড়েছে, স্থবিরতা নেমে এসেছে। ফলে স্থানীয় উন্নয়ন, সেবা প্রদান ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বেশির ভাগ পৌরসভায় হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় হার ৫০ শতাংশেরও নিচে। বাজেট বরাদ্দ থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ কাজ এবং নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চলতি মাসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর চিঠির প্রেক্ষিতে অর্থবছরের দুই মাসের জন্য ৯ শ’ কোটি টাকা বাড়তি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি, আর্থিক প্রবাহে ধীরগতি এবং প্রকল্প অনুমোদনে জটিলতা। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর হযবরল অবস্থা। এই কারণে এক ধরনের অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে।

বাজেট আছে, কিন্তু অর্থ ছাড়ে ধীরগতি

স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় প্রতি বছর ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলোর জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় বরাদ্দ করা হয়। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), বিশেষ অনুদান, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো এবং বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। বিভিন্ন জেলার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, প্রশাসক এবং পৌর কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বরাদ্দ ঘোষণার পরও অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে। অনেক প্রকল্পের টেন্ডার সম্পন্ন হলেও অর্থ ছাড় না হওয়ায় কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে চলমান প্রকল্পের বিল পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় ঠিকাদাররা কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।

একাধিক পৌরসভা ও ইউনিয়ন কর্মকর্তা জানান, রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বরাদ্দ সময়মতো না পাওয়ায় কর্মচারীদের বেতনভাতা এবং দৈনন্দিন পরিচালনব্যয় মেটাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সর্বশেষ ভোটের তথ্য : বর্তমানে পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় চার হাজার ৫৭৮টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬৪টি জেলা পরিষদ (তিন পার্বত্য জেলাসহ), ৩৩০টি পৌরসভা এবং ১২টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। বাংলাদেশে সর্বশেষ বৃহৎ পরিসরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২১-২২ সালে। ওই নির্বাচনে ধাপে ধাপে দেশের অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ করা হয়। অন্যদিকে সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয় ২০২০-২১ সালে উপজেলা পরিষদের সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০২৪ সালে কয়েক ধাপে।

২০২৪ সালের আগস্টে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ : রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের আগস্টে স্থানীয় সরকার বিভাগ একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের বিভিন্ন স্তরের মোট ৮৭৬ জন জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ করে। এর মধ্যে ৬০ জন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ৪৯৩ জন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং ৩২৩ জন পৌর মেয়র ছিলেন।

নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সিদ্ধান্তহীনতা : স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান সঙ্কটের অন্যতম কারণ হলো অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অভাব। ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনা সাধারণত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। কিন্তু প্রশাসনিক তত্ত্বাবধান বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কমে গেছে। উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, বাজার ইজারা কিংবা অবকাঠামো সংস্কারের মতো বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। ফলে ছোটখাটো কাজও মাসের পর মাস ঝুলে থাকছে।

সংশোধিত এডিপিতে উন্নয়নসহায়তা : এডিপির বরাদ্দ থেকে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার বিভাগে (থোকসহ) চলতি অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ২৪৪ প্রকল্পের বিপরীতে ৩৭ হাজার ৭০৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ৫৫.৯৭ শতাংশ বা ২১ হাজার ১০৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর উন্নয়নসহায়তায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ৯টি খাতে বরাদ্দ তিন হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এখানে ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়নসহায়তা ৮৭০ কোটি টাকা, উপজেলা উন্নয়নসহায়তা ৭৭০ কোটি টাকা। জেলা পরিষদ বাবদ উন্নয়নসহায়তা ৫৬০ কোটি টাকা, পৌরসভা উন্নয়নসহায়তা ৪৮০ কোটি টাকা, সিটি করপোরেশনের উন্নয়নসহায়তা ৪২০ কোটি টাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নসহায়তা ৩৩০ কোটি টাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্থানীয় সরকার উন্নয়নসহায়তা ১০০ কোটি টাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের জন্য উন্নয়নসহায়তা ১০০ কোটি টাকা।

স্থবির উন্নয়ন প্রকল্প : মাঠপর্যায়ের তথ্য থেকে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন ইউনিয়নে গ্রামীণ সড়ক সংস্কার, কালভার্ট নির্মাণ, ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে, কাঁচা ও আধাপাকা গ্রামীণ সড়ক সংস্কার বিলম্বিত হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন নির্মাণের কাজ আটকে আছে। ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও কমিউনিটি অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। পৌরসভাগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রাস্তার আলোকায়ন প্রকল্প ধীরগতি। আর উন্নয়নকাজ বন্ধ থাকায় দৈনন্দিন ভোগান্তি বাড়ছে। বর্ষা মৌসুমে সড়ক ও ড্রেনেজ সমস্যার কারণে জনদুর্ভোগ আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজস্ব সঙ্কটে পৌরসভা : বাংলাদেশে অধিকাংশ পৌরসভা এখনও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। নিজস্ব রাজস্ব থেকে পরিচালন ব্যয় মেটাতে সক্ষম পৌরসভার সংখ্যা তুলনামূলক কম। বেশির ভাগ পৌরসভায় হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় হার ৫০ শতাংশেরও নিচে। নতুন কর নির্ধারণ, বকেয়া আদায় এবং ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকায় আর্থিক সক্ষমতা বাড়ছে না। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ কমে গেলে বা বিলম্বিত হলে এসব পৌরসভা প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ফলে উন্নয়ন ব্যয় নয়, মৌলিক সেবাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

ঠিকাদারদের অভিযোগ : অনেক ঠিকাদার বলছেন, প্রকল্পের অনুমোদন ও বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতার কারণে তারা নতুন কাজ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তারা কাজ করেও বিল পাচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সামনে চ্যালেঞ্জ:

অর্থনীতিবিদ ও স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকদের মতে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় সরকার খাতে বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিশ্চিত না হলে কাক্সিক্ষত ফল আসবে না। কারণ বর্তমানে সবচেয়ে বড় সঙ্কট অর্থের অভাব নয়, বরং অর্থ ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি। তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়নকার্যক্রম দীর্ঘদিন স্থবির থাকলে গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক সেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার কার্যকর ও গতিশীল করা এখন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু বাজেট বরাদ্দ দিলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। অর্থ ছাড়, প্রকল্প অনুমোদন, স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জবাবদিহিতামূলক প্রশাসনিক কাঠামো একসাথে কার্যকর না হলে উন্নয়ন থমকে যায়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর রাখতে উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের অর্থ দ্রুত ছাড় নিশ্চিত করা, স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও প্রশাসনিক সমন্বয় বৃদ্ধি এবং পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

সুজন সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, স্থানীয় সরকার একটা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। একটা হযবরল অবস্থা। সবসময়ই আমাদের রাজনীতিবিদরা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে অনীহা শুধু নয়, এটাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য আমাদের সংসদ সদস্যরা সবসময় তৎপর ছিলেন। এখন এটা অব্যাহত রয়েছে। যেটা করা হচ্ছে সংসদ সদস্যদেরকে আবার স্থানীয় সরকারে সরাসরি সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা হচ্ছে। তাদেরকে অফিস দেয়া হচ্ছে উপজেলা পর্যায়ে। তিনি বলেন, এখন দ্রুত যদি নির্বাচন করা যায় তাহলে যে স্থবিরতা চলেছে, এই স্থবিরতা কেটে যাবে।

মুনিরা খান : ফেমার প্রেসিডেন্ট মুনিরা খানের সাথে এ ব্যাপারে কথা হলে তিনি দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা যারা গ্রাসরুট লেভেল থেকে ওপর পর্যন্ত ডেমোক্র্যাসিতে বিশ্বাস করি আমরা হতাশ। কারণ সবসময় আমরা যা বলে আসছি, একটা দেশে গণতন্ত্রায়নের জন্য সবচেয়ে প্রথম দরকার হচ্ছে মাঠ লেভেল থেকে গণতান্ত্রিক শিক্ষাটা দেয়া। তিনি বলেন, আমাদের দেশে নিচের থেকে যদি পলিটিক্যাল পার্টি থাকে তাহলে হয় কি ইনফ্লুয়েন্সটা হয়। তাহলে সেই পার্টির লোকজন ছাড়া অন্য কেউ আর উপকৃত হয় না। ওভারঅল যে একটা উন্নতি, সেটা হয় না স্থানীয় পর্যায়ে।

মুনিরা খান বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষ সেবা না পাওয়ার পেছনে মানুষেরও দোষ আছে। কারণ তাদের ট্রেনিং নাই। তাদের কতটুকু কর্তব্য সেটা তারা জানে না। তিনি বলেন, গভমেন্টের সুশাসনের অভাব আছে বলেই স্থানীয় সরকারে স্থবিরতা, উন্নয়নকাজ ধীরে, মানুষ সেবা পাচ্ছে না। সত্যিকার অর্থে আমরা দেশে গণতন্ত্রায়ন করতে চাই কি না, সংস্কার করতে চাই কি না, গ্রাসরুট লেভেল থেকে আমি কাজ করতে চাই কি না এবং কাজ করতে দিতে চাই কি না? সে ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি এবং গুডউইলের অভাব আছে। তিনি বলেন, এখনকার ঘটনাগুলো দেখে আমি হতাশ হচ্ছি।