জমি বিক্রি করে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছে গ্রামের মানুষ

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
  • ঢাকা জেলার সাভার ও আশুলিয়া জমি বিক্রির হার সবচেয়ে বেশি
  • ব্যাংক লোনের ঝামেলায় ভিটেমাটি বিক্রি করেছেন অনেকে

ঢাকার কাছে আশুলিয়ার ইয়ারপুর গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জ্ঞানমোহন সরকার। পিতার জমি বিক্রির টাকা থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে স্থানীয়ভাবে একটি ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু ব্যবসার মন্দাভাব দেখে বিকল্প পন্থা খুঁজতে বুদ্ধি করে কয়েক বছর আগেই এক্সিম ব্যাংকের জামগড়া শাখায় ১৫ লাখ টাকা এফডিআর করে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু ব্যাংক থেকে অর্থ লুট করে বিদেশে পাচারকারী একটি সিন্ডিকেট পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই ফোকলা করে ফেলেছে। এখন জ্ঞানমোহন তার গচ্ছিত আসল টাকাই তুলতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে আরো জমি বিক্রির জন্য ক্রেতার সন্ধান করছেন তিনি।

জিরাবো গ্রামের রসুল বেপারী। পেশায় কৃষক। মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে বেশ কিছু স্বর্ণালঙ্কার কিনতে হবে তাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে এত টাকা তার হাতে নেই। এ ছাড়া বিয়ে মানেই আরো নানা খাতে খরচের বিষয় তো আছেই। ফলে বাধ্য হয়ে তাকে ফসলি জমির থেকে কিছু জমি বিক্রি করতে হচ্ছে।

সাভারের হেমায়েতপুরের মোতালেব শেখ। দুই ছেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে এখন বেকার। ফলে মোতালেব শেখকে তার ভিটেবাড়ির পাশের একখণ্ড জমি বিক্রি করেই দুই ছেলেকে ব্যবসা করার জন্য পুঁজি সংগ্রহ করে দিতে হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অনেক এলাকাতেই মানুষ এখন বিকল্প আয়ের বিকল্প উৎস তৈরি করতে ভিটেবাড়ির জমি কিংবা ফসলি জমি বিক্রি করে পুঁজি সংগ্রহ করছেন। তাদের কারোরই হাতে নগদ কোনো অর্থকড়ি নেই। ফলে বাধ্য হয়েই শেষ সম্বলের অংশ জমি বিক্রি করার আর কোনো বিকল্প পাচ্ছে না গ্রামের মানুষ।

অবশ্য বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত এবং জমি বিক্রির হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষই এখন জমিজমা বেশি বিক্রি করছেন। সম্প্রতি ঢাকা জেলার জমি রেজিস্ট্রি করার ২১টি সাব রেজিস্ট্রার দফতর থেকে যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে সেখানেও দেখা গেছে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের জমি বিক্রির হার অনেক বেশি। তথ্য সূত্র বলছে ঢাকা জেলার মধ্যে পিছিয়ে পড়া বা অনগ্রসর এলাকা সাভার এবং আশুলিয়ার গ্রামের মানুষজনই জমি বিক্রি বেশি করছেন। পাশাপাশি উত্তরার কিছু গ্রাম এলাকা, কেরানীগঞ্জ এবং বাড্ডা এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যেও জমি বিক্রির প্রবণতা বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে আরো দেখা গেছে এক মাসে জমি বিক্রির হারের হিসাব অনুযায়ী এক হাজারের বেশি মানুষ জমি কেনাবেচা করেছে অর্থাৎ জমি রেজিস্ট্রি হয়েছে আশুলিয়া, সাভার, কেরানীগঞ্জ, বাড্ডা, উত্তরায়। অন্য দিকে একমাসে পাঁচশ’র কম দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে তেজগাঁও, সূত্রাপুর, ধানমন্ডি ও দোহারে। এই পরিসংখ্যান এটাই ইনডিকেট করছে যে, আয় উপার্জন কম এবং বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছে এমন লোকজনই জমি বিক্রি করে বিকল্প আয়ের পথ তারা পেতে চায়। আবার দ্রুত উন্নত হচ্ছে এমন উপজেলা বা থানা এলাকার লোকজনও জমি বিক্রি করে অর্থ লগ্নি করে বিকল্প কোনো পন্থায় নিজের বা পরিবারের আয়ের পথ করার চিন্তা করছেন।

এ বিষয়ে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে জমি বেচাবিক্রির যে খতিয়ান দেখা গেছে এক মাসে শুধু সাভার এবং আশুলিয়াতেই তিন হাজার ১৪৬ জন জমি বিক্রি করেছেন। অন্য দিকে ঢাকার ভেতরে অর্থাৎ অভিজাত এলাকা হিসেবে খ্যাত ধানমন্ডিতে জমি বিক্রির হার অনেক কম, যা সংখ্যায় মাত্র ৩৬৬ জন। শতকরা হিসেবে মাত্র শূন্য দশমিক ১১ ভাগ। এরপর জমি বিক্রিতে এগিয়ে আছে বাড্ডা এলাকার মানুষ। সেখানে এক মাসে জমি বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৩৫৯টি। এরপর জমি বিক্রি বেশি হয়েছে কেরানীগঞ্জে। এর সংখ্যা ১১২০ জন। উত্তরার গ্রামের এলাকাতেও ইদানীং জমি বিক্রি বেশি হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরায় জমি বিক্রির সংখ্যা ছিল এক হাজার ২০ জনের। রাজধানীর তেজগাঁও, সূত্রাপুর, মোহাম্মদপুর, গুলশান, মিরপুর, পল্লবী, দোহার এলাকাতে জমি বেচাবিক্রির হার তুলনামূলক অনেক কম। কারণ হিসেবে জানা গেছে এসব এলাকার মানুষজনের আয় অন্য এলাকার লোকজনের তুলনায় বেশি।

গ্রামের মানুষের এমন দুর্ভোগ আর নিম্নআয় বা ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আতাউল হক প্রামাণিক। গতকাল মঙ্গলবার নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে তিনি এ বিষয়ে বলেন গ্রামের মানুষ কোনো কিছু না বুঝেই অনেকে ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ে। একসময় তাকে ঋণ পরিশোধ করতেই সর্বস্বান্ত হতে হয়। অনেকে আবার বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে কিংবা ঋণ পরিশোধ করতেই ভিটেমাটি বিক্রি করতে হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকেই ঋণ এবং পরিশোধের কিস্তির বিষয়েও একটি গ্যাপ তৈরি হয়। এভাবে তাকে পুনঃঋণ কিংবা ধারদেনা করে আবারো বিপদে পড়েন। কিছু লোক আছেন অতি লোভে পড়েও ঋণ করে বিপদ ডেকে আনেন। ঋণ যে পরিশোধ করতে হবে এটাও অনেকে ভুলে যায়। ফলশ্রুতিতে তাকে জমি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হতে হয়।