চট্টগ্রামের অধিকাংশ আসনে বিএনপি-জামায়াত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। ভোটাররা দীর্ঘ দেড় যুগ পর অবাধে তাদের ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন। চট্টগ্রামে সব মানুষের মুখে মুখে এখন ভোট ছাড়া আর কিছুই যেন নেই। মহানগরী ও জেলা মিলিয়ে মোট ১৬টি সংসদীয় আসন। হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে। আবার কোথাও কোথাও সহিংসতারও আশঙ্কা করছেন ভোটাররা। তাদের আশা বহু বছর পর এবার নিজেদের ভোটাধিকার নির্বিঘেœœ প্রয়োগ করতে পারবেন।

সন্দ্বীপসহ উত্তর চট্টগ্রামের আসনগুলোর মধ্যে পাঁচটিতে বিএনপির সাথে জামায়াতের, একটিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এবং একটি আসনে বিএনপি-জামায়াত-ইসলামী ফ্রন্ট ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস মিলেছে।

চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই-জোরালগঞ্জ) আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। আসনটিতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে লড়ছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান। ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন বিএনপি নেতা নুরুল আমিন।

চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি আসনে বিএনপি-জামায়াত দু’ দলই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ নুরুল আমিন ক্লিন ইমেজের কারণে বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছেন। অপর দিকে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা ঋণ খেলাপির অভিযোগে বাতিল করা হয়েছিল। পরে হাইকোর্টেও বাতিল হয় এবং আপিল বিভাগে লিভ টু আপিলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুমতি মিললেও ফলাফল তার পক্ষে গেলেও গেজেট প্রকাশ করা হবে না মর্মে আদেশ দেয়া হয়েছে। তবে আসনটিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।

চট্টগ্রাম-৩ সন্দ্বীপ আসনে বিএনপির প্রবীণ প্রার্থীর সাথে জামায়াতের নবীন প্রার্থীর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিয়েছেন স্থানীয়রা। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশা ইতঃপূর্বে আসনটি থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বর্তমানে বয়োবৃদ্ধ। অপর দিকে জামায়াতের প্রার্থী আলাউদ্দিন সিকদার বয়সে এখনো তরুণ। তার কোনো ইমেজ সঙ্কট নেই। তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জামায়াতের আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন এবং ছাত্রজীবনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন।

চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড ও সিটি করপোরেশন আংশিক) এ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীও ঋণ খেলাপি হিসেবে প্রার্থিতা বাতিল করার বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আদালতের আদেশে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারলেও ফলাফল আপিল চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।

আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিক আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত। অতীতে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে সীতাকুণ্ডে জামায়াতের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। ফলে আসনটিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলেছে। একই সাথে আসনটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কেন্দ্রে সহিংসতার আশঙ্কা করছেন ভোটাররা।

চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারী ও সিটি করপোরেশনের আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত। আসনটিতে বিএনপির মীর হেলাল উদ্দিনের সাথে ১১ দলীয় জোটের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা নাসির উদ্দিন মুনীরের রিকসা প্রতীকের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

চট্টগ্রাম ও (রাউজান) আসনটি সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত। বাসিন্দারা বরাবরই নির্বিঘেœ ভোট দেয়ার পরিবেশ নিয়ে শঙ্কায় থাকেন। তবে প্রশাসনিক কঠোর নজরদারিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ পেলে ধানের শীষের গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, দাঁড়িপাল্লার শাহজাহান মঞ্জু এবং মোমবাতি প্রতীকের ইলিয়াস নুরীর মাঝে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরীর সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে জামায়াতের প্রার্থী ডা: এ টি এম রেজাউল করিমের। আসনটিতে এবার আঞ্চলিকতার আওয়াজও উঠেছে। ফলে এর সুবিধা পাচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী। চট্টগ্রাম ৮ : মহানগরীর চান্দগাঁও এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৮ আসনটিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধানের শীষের এরশাদ উল্লাহ ও দাঁড়িপাল্লার ডা: আবু নাসেরের মধ্যে। যদিও ১১ দলের প্রার্থী হিসেবে আসনটি এনসিপিকে দেয়া হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীর তিনটি আসনেই বিএনপি এবং জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া এবং বাঁশখালী এ তিনটি আসনে ভোটের দৌড়ে এগিয়ে আছেন ১১ দলের প্রার্থীরা। আর পটিয়া এবং আনোয়ারা-কর্ণফুলী এ দু’টি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।

চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ, সাতকানিয়া আংশিক)-এ আসনে ১১ দলীয় জোটপ্রার্থী এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব:) ড. অলি আহমদের ছেলে ওমর ফারুক ভোটের সমীকরণে এগিয়ে রয়েছেন। তবে বিএনপির প্রার্থী জসিম উদ্দিনও জয় পেতে মরিয়া।

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী ভোটের মাঠে এগিয়ে রয়েছেন। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী ব্যবসায়ী নাজমুল মোস্তফা ভোটের মাঠে একেবারেই নতুন। তা ছাড়া সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনটি বরাবরই জামায়াত অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত।

চট্টগ্রাম-১৬ বাঁশখালী আসন থেকে বিএনপির মরহুম জাফরুল ইসলাম চৌধুুরী বারবার এমপি নির্বাচিত হলেও উপকূলীয় এ জনপদের মানুষের দুর্ভোগ রয়েই গেছে। উন্নয়নের ছোঁয়া তেমন লাগেনি এ এলাকায়। ফলে এবারের নির্বাচনে সে সবই ফ্যাক্টর হিসেবে সামনে আসছে। আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম পৈত্রিক সূত্রে বেশ জনপ্রিয়। আসনটিটতে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক বিএনপি নেতা লেয়াকত আলীও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) এ আসনে বিএনপির প্রার্থী এনামুল হকের অবস্থান ভালো বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী ডা: ফরিদুল আলমও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার চেষ্টায় আছেন। চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ার-কর্নফুলী) এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম আগেও এখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্য দিকে জামায়াতের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান নবীন হলেও জুলাই আন্দোলনের প্রজন্ম এবং নারীদের প্রচুর সমর্থন পাচ্ছেন তিনি।