সদ্য সমাপ্ত বিধান সভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজ্য সরকার বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেছেন, নির্বাচনের সময় যে যাই কথা বলুক, সরকার গঠন ও ক্ষমতা গ্রহণের পর নেয়া সিদ্ধান্তগুলো বিবেচনাপ্রসূত হতে হয়। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আমি মনে করি না বাংলাদেশের জন্য উসকানিমূলক কোনো কাজ পশ্চিমবঙ্গ সরকার করবে। ভারত তার অংশে কাঁটাতারের বেড়া দেবে। এ ব্যাপারে আমাদের তেমন কিছু বলার নেই। কিন্তু দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক যে ভালো না, সেটার একটা ইঙ্গিত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়। এটা থেকে বার্তাটাও ভালো আসে না। বাংলাদেশ ও ভারত যদি সম্পর্ক উন্নত করতে চায়, তবে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া উচিত হবে না যা ইঙ্গিত দেয় সম্পর্কটা ভালো না।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান এ কথা বলেছেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠন এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এর প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-
প্রশ্ন : পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য ৪৫ দিনের মধ্যে জমি হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছে। আপনি বিষয়টিকে কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?
মাহফুজুর রহমান : নির্বাচনের সময় অনেক রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া হয়, কিন্তু সরকার গঠনের পর সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবতা ও নীতির ভিত্তিতে নেয়া হয়। আমার ধারণা, বাংলাদেশকে উদ্দেশ করে কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গ সরকার নেবে না। ভারত তার নিজস্ব সীমান্তে নিরাপত্তার প্রয়োজনে ব্যবস্থা নিতেই পারে। এ বিষয়ে আমাদের সরাসরি কিছু বলার নেই। তবে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বার্তা দেয় না। সম্পর্ক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের পদক্ষেপ এড়িয়ে চলাই উত্তম।
প্রশ্ন : ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ- দুই জায়গাতেই এখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। এতে কি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন গতি পেতে পারে?
মাহফুজুর রহমান : সম্পর্ক উন্নত করতে হলে দুই দেশকেই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কেবল একপক্ষের উদ্যোগে তা সম্ভব নয়। বাংলাদেশও তার দিক থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে- এমনটাই প্রত্যাশা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, যা ভারতের সাথে সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে অন্তর্বর্তী সময়ে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে দুই দেশকেই বাড়তি কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রশ্ন : বর্তমানে ভারতীয় ভিসাকার্যক্রম সীমিত। বাংলাদেশীদের জন্য চিকিৎসা ছাড়া অন্য ভিসা সহজ করার সম্ভাবনা কতটা?
মাহফুজুর রহমান : দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিষয়গুলো দ্রুত আলোচনার টেবিলে আনা উচিত। বাংলাদেশীদের জন্য সব ধরনের ভিসা আবার চালু করা প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিকভাবে কঠিন নয়। ভারত চাইলে এটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। নিয়মিত সংলাপ থাকলে এসব সমস্যার সমাধান সহজ হয়।
প্রশ্ন : সীমান্ত হত্যা দীর্ঘদিনের একটি সংবেদনশীল ইস্যু- এ বিষয়ে কী ধরনের সমাধান সম্ভব?
মাহফুজুর রহমান : ভারত বরাবরই সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বাস্তবতা হলো, সীমান্তে অনেক সময় নিরস্ত্র নাগরিক আটক হন। তাদের গ্রেফতার করে আইনি প্রক্রিয়ায় নেয়া যেতে পারে; প্রাণহানির প্রয়োজন নেই। একটি কার্যকর ও বাধ্যতামূলক চুক্তির মাধ্যমে এ সমস্যা শূন্যে নামানো সম্ভব। একইভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে।
প্রশ্ন : পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো অগ্রগতি সম্ভব কি?
মাহফুজুর রহমান : আমার ধারণা বিষয়টি অতটা সহজ হবে না। তিস্তা চুক্তির যে খসড়া নিয়ে দুই দেশ একসময় সম্মত হয়েছিল, তার পর দীর্ঘ সময় পার হয়েছে। এখন দুই দেশই সেটি পুনর্মূল্যায়ন করতে চাইতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন ও ভারতের আলাদা প্রস্তাব রয়েছে। চুক্তির খসড়া পর্যালোচনার সময় ভারত এই প্রকল্পের বিষয়টি তুলতে পারে। তাই এ ইস্যুতে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতি থাকতে হবে।
প্রশ্ন : গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শিগগির শেষ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?
মাহফুজুর রহমান : ভারতের সাথে সই হওয়া গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। নবায়নের আগে বাস্তবতার নিরিখে দুই দেশই চুক্তি পর্যালোচনা করতে পারে। পানিবণ্টন ও আঞ্চলিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা করা উচিত। এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সমাধানের জন্য জোরদার ও নিয়মিত সংলাপ প্রয়োজন। নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমেই স্থায়ী সমাধান বেরিয়ে আসবে।
প্রশ্ন : সার্বিকভাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কী প্রয়োজন বলে মনে করেন?
মাহফুজুর রহমান : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও জোরদার সংলাপ। সীমান্ত, ভিসা, পানিবণ্টন বা নিরাপত্তা- সব ইস্যুর সমাধান এক টেবিলে বসেই সম্ভব। পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে ধারাবাহিক যোগাযোগ ও ইতিবাচক কূটনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য। সম্পর্কের উন্নতি কোনো একক পদক্ষেপে নয়, বরং ধারাবাহিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্ভব।



