এক দশক পর দেশে এসে মা, ভাই বোনসহ বাড়ি ফিরলেন লাশ হয়ে

অন্যান্য স্থানে বাবা-ছেলেসহ নিহত ৫, আহত আরো ৫ জন

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় এক প্রবাসীসহ একই পরিবারের চারজন নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় প্রাইভেট কারের চালক নিহত ও দুই শিশু আহত হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে বাবা-ছেলে, বগুড়ার কাহালুতে ফ্রিজমিস্ত্রি, নাটোরে বড়াইগ্রামে নারী শ্রমিক এবং নওগাঁয় আটোরিকশা আরোহী পৃথক পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে দুই শিশুসহ তিনজন।

ভাঙ্গায় নিহত ৫

যশোর অফিস ও ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে এক দশকেরও বেশি আগে তরুণ বয়সেই মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেখানে দীর্ঘ ১১ বছর কঠিন পরিশ্রম করে গতকাল দেশে ফিরেছিলেন নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে।

এরপর ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রাইভেটকারে মা, বোন ও ছোট ভাইসহ যশোরের ঝিকরগাছার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। কথা ছিল বাড়ি ফিরে বিয়ে করবেন। আজ বুধবার (৩ মে) মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। তবে সেসব স্বপ্ন-আনন্দ নিমিষেই বিষাদে পরিণত হয়েছে। রেমিট্যান্স যোদ্ধা আরিফ ইসলাম (২৫) জীবিত বাড়ি পৌঁছাতে পারলেন না। পথে ভোর ৪টার দিকে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম ফ্লাইওভার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় চলে গেছেন না ফেরার দেশে। এ ঘটনায় আরো নিহত হয়েছেন মাসহ আরো চারজন। এতে যেখানে চলছিল বিয়ের প্রস্তুতি, আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে ছিল উৎসবের আমেজ তা মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকের মাতমে।

পুলিশও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যশোরগামী প্রাইভেটকারটি মালিগ্রাম বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়কের পাশে গ্যাস সিলিন্ডারবোঝাই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই আরিফ ইসলামসহ চারজন নিহত হন। গুরুতর আহতদের ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে রাকিবুল ইসলামকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

আরিফুলের পাশাপাশি এ ঘটনায় নিহতরা হলেন- মা নুরজাহান বেগম (৫০), বোন আয়েশা আক্তার (৩২) ও ছোট ভাই রাকিবুল ইসলাম (১৮)। একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রাইভেট কারের চালক জাহিদ হোসেন। তিনি পার্শ্ববর্তী মনিরামপুর উপজেলার গৌরপুর গ্রামের বাসিন্দা। এ ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন আরিফুলের বোনের মেয়ে মোছা: তাসফিয়া (৩) ও ছেলে মো: হুসাইন (৬)।

শিবচর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ও ভাঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান চালান। ঘটনাস্থলে নিহতদের লাশের সুরতহাল সম্পন্ন করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে প্রাইভেটকারটি ট্রাকের পেছনে আটকে থাকায় কাটার যন্ত্র ব্যবহার করে চালকের লাশ উদ্ধার করতে হয়। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সবার লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাক ও প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্তও চলছে।

নিহত আয়শা খাতুনের স্বামী ইলিয়াস সরদার বলেন, আরিফ প্রায় ১০ বছর আগে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিল। অনেক কষ্ট করে পরিবারের ঋণ পরিশোধ ও ঘরবাড়ির কাজ করেছে। এবার দেশে এসে বিয়ে করবে- এ নিয়ে পুরো পরিবার আনন্দে ছিল। তিন মাসের ছুটি নিয়ে দেশে ফিরছিল। তাকে আনতে শাশুড়ি, আমার স্ত্রী, শ্যালক রাকিবুল এবং আমার দুই সন্তান বিমানবন্দরে গিয়েছিল। কিন্তু তারা আর ঘরে ফিরতে পারল না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরো বলেন, আমার শ্বশুর একজন ইজিবাইকচালক। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তার ছোট সংসার। এক রাতেই স্ত্রী, দুই ছেলে ও মেয়েকে হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেলেন। এতদিন পর ছেলেকে বরণ করে নেয়ার আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে আজীবনের বেদনায়।

স্থানীয়রা জানান, আরিফের দেশে ফেরাকে ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরেই পরিবারে উৎসবের আবহ ছিল। বিয়ের কথাবার্তা প্রায় চূড়ান্ত ছিল। আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই তার আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার পথেই সব স্বপ্ন থেমে যায় নির্মম এক সড়ক দুর্ঘটনায়।কর্ণফুলীতে বাবা-ছেলে নিহত

পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, বাড়ি যাওয়ার সময় শাহ্ আমানত রহ: সেতুর (কর্ণফুলী সেতু) টোল প্লাজার কাছে পিকআপের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী বাবা-ছেলে নিহত হয়েছেন। গতকাল সকাল ৮টায় দিকে সেতুর কক্সবাজার প্রান্তে টোলপ্লাজার পূর্বে স্পিডব্রেকারে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন- আনোয়ারা উপজেলার চাতরী ইউনিয়নের সিংহরা গ্রামের বাবু দর্গাপদ মল্লিক (৭৫) ও তার ছেলে বিধান মল্লিক (৪৭)। বিধান মল্লিক দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে কর্ণফুলী থানার উপপুলিশ পরিদর্শক মো: মাহিন জানান, একত্রে মোটরসাইকেলে (চট্টমেট্রো-হ-১৮-১৯৭৪) বাবা-ছেলে সেতু পার হয়ে টোলপ্লাজার সামান্য দূরে স্পিডব্রেকার ক্রস করার সময় দ্রুতগামী পিকআপ-(ভোলা ন-১১-০২৮৭) পিছনে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই বাবা নিহত হন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় ছেলেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে গেলে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

কাহালুতে নিহত ১

বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়ার কাহালুতে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ফ্রিজমিস্ত্রি মো: তামিম হোসেন (১৮) গতকাল বেলা ১১টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত তামিম হোসেন বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের মো: খোকনের ছেলে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন একই গ্রামের মো: ফজলুর রহমানের ছেলে মো: শামীম হোসেন (১৮)। তারা দু’জনেই পেশায় ফ্রিজমিস্ত্রি ছিলেন।

জানা গেছে, সকালে তামিম ও শামীম বাড়ি থেকে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে ফ্রিজ মেরামতের কাজের উদ্দেশ্যে কাহালু বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে মহাসড়কের মুরইল বাসস্ট্যান্ড এলাকার আরেফিন জুট মিলের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে একটি অজ্ঞাত কাভার্ডভ্যান মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দিলে ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তামিম।

বড়াইগ্রামে নারীশ্রমিকের মৃত্যু

বড়াইগ্রাম (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, নাটোরের বড়াইগ্রামে পিকআপের ধাক্কায় লাজেলা খাতুন (৩৫) নামে এক নারীশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে উপজেলার গড়মাটি কলোনি এলাকায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত লাজেলা খাতুন গড়মাটি গ্রামের মৃত আলী হোসেনের মেয়ে।

স্থানীয়রা জানান, লাজেলার পার্শ্ববর্তী গড়মাটি ঘাট এলাকায় বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু স্বামী ঠিকমতো ভরণপোষণ না দেয়ায় তিনি বাবার বাড়ি চলে আসেন। দুই শিশুসন্তানসহ নিজের জীবিকার প্রয়োজনে অন্যের জমিতে কাজ করতেন। মঙ্গলবার সকালে তিনি ঢেঁড়স তোলার উদ্দেশ্যে বের হয়ে মহাসড়ক পার হওয়ার সময় একটি দ্রতগামী পিকআপ তাকে সজোরে ধাক্কা দিলে মহাসড়কে ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

নওগাঁয় যুবক নিহত

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগাঁয় ঢাকাগামী যাত্রীবাহী বাস ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নওসাদ আলী (২৫) নামে এক অটোরিকশাযাত্রী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অটোরিকশার যাত্রী দুই শিশু গুরুতর আহত হয়েছে।

গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার সময় নওগাঁ-বগুড়া আঞ্চলিক মহাসড়কের শহরের ঢাকা বাসস্ট্যান্ড এলাকার তুলসীগঙ্গা ব্রিজ মোড়ে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত নওসাদ আলী নওগাঁ সদর উপজেলার দোগাছী সিংড়াপাড়া গ্রামের মৃত জাফির আলীর ছেলে।