অনুকূল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিশ্চিত করে স্থানীয় নির্বাচনে যাবে বিএনপি

কয়েকটি ইউপি দিয়ে শুরু করার টার্গেট

খুব শিগগির স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেয়া হবে, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ কর্তারা এমন ঘোষণা দিলেও নিজেদের গুছিয়ে এবং মাঠের উপযুক্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে অগ্রাধিকার দিয়েই এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিতে চাপ দিলেও ক্ষমতাসীনরা জানে, লোকাল নির্বাচনে বিএনপিকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। কেননা জাতীয় রাজনীতি আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলীয় প্রতীক না থাকায় ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

চলতি বছরে বা খুব শিগগির স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেয়া হবে, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ কর্তারা এমন ঘোষণা দিলেও নিজেদের গুছিয়ে এবং মাঠের উপযুক্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে অগ্রাধিকার দিয়েই এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিতে চাপ দিলেও ক্ষমতাসীনরা জানে, লোকাল নির্বাচনে বিএনপিকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। কেননা জাতীয় রাজনীতি আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলীয় প্রতীক না থাকায় ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। এই সুযোগটি অনেকেই নিতে চাইবে। এজন্য নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে দল গোছানোর পাশাপাশি কোন্দল মেটানো, নিতপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এসব বিবেচনায় নিতে হচ্ছে তাদের। দলটির হাইকমান্ড কোনোভাবেই জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ক্ষুণœ হোক সেটা চায় না। তাই মাঠের উপযুক্ত প্রেক্ষাপট তৈরির পরই নির্বাচন কমিশনকে তফসিল ঘোষণার সবুজসঙ্কেত দেয়া হবে বলে একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন।

সূত্র মতে, জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার এবং টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তার প্রথম অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে এই আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে মাঠের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করাই এই মুহূর্তে সরকারের সবচেয়ে দূরদর্শী ও অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ। সরকার চায় দল হিসেবে জাতীয় নির্বাচনের ন্যায় বিজয়ের ধারাবাহিকতা স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে যেন হয়। একইসাথে সবার কাছে বিতর্কমুক্ত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনও যেন করা যায়। এজন্য দল শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সূত্র মতে, দেশে কয়েকটি স্তরে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হয়। বর্তমানে দেশে ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ও প্রায় চার হাজার ৫৭০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। সর্বশেষ সারা দেশে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২১ সালে। পরিষদের মেয়াদ পাঁচ বছর। সর্বশেষ বড় পরিসরে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২০-২১ সালে, কয়েকটি ধাপে। ৬৪টি জেলা পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২২ সালে। ওই নির্বাচনে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। যেমন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়েছিল ২০২০ সালে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২১ সালে। অন্য সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনও ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়াদ পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেরই মেয়াদ শেষ হয়েছে বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্বে নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসকদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজন করা হবে। তবে কবে থেকে এটি শুরু হবে সেটির দিনক্ষণ ঠিক না হলেও চলতি বছরের শেষের দিকে কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষাদ নির্বাচন করতে চায় দলটি। এটা হতে পরীক্ষামূলক প্রথম ধাপে বরিশাল বিভাগ থেকে ভোট আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগে ইউপি নির্বাচন হতে পারে। এসব নির্বাচনে রাজনীতিক পরিবেশ ও ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে সরকার।

এলজিআরডিমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, যদিও বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার সংস্থায় প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তবে উপযুক্ত সময়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এটা হতে পরীক্ষামূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। একই সুর শোনা গেছে দলটির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যেও। তিনি মাঠপর্যায়ের নেতাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক। কাউকে জোর করে বা প্রভাব খাটিয়ে জয়ী হওয়ার সুযোগ দেয়া হবে না। তাই এখন থেকেই জনগণকে সাথে নিয়ে মাঠের পরিবেশ শান্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাখতে হবে। নিজ যোগ্যতায় নির্বাচিত হতে হবে।

সূত্র মতে, শিগগির বা এই বছরের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের কথা বললেও বিএনপি সরকার এখনই স্থানীয় সরকারের বড় কোনো পর্যায়ে নির্বাচন দিতে চাচ্ছে না বরং আগে মাঠ পর্যায়ে দলের ভিত্তি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মনোযোগ তাদের।

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং অন্যান্য ইস্যুতে মাঠ আবারো উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতির মাঠে সক্রিয় করার একটি প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্থানীয় নেতৃত্ব নিয়ে কিছু অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও উপদলীয় কোন্দল দেখা দিয়েছে। নির্বাচন দেয়ার আগে দলটির হাইকমান্ড এই অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং মেটাতে এবং ঐক্য সুসংহত করতে চায়। সার্বিকভাবে মাঠের রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা কমিয়ে একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক এবং স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

জানা গেছে, বিএনপি ইতোমধ্যেই তাদের তৃণমূল ইউনিটগুলোকে সম্ভাব্য জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছে। একইসাথে কোন্দল মেটাতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ জেলাতেই কোন্দল এখনো প্রকাশ্যে রয়েছে। বিদ্রোহী অনেকেই এলাকায় শক্তিশালী হওয়ায় এর প্রভাব স্থানীয় নির্বাচনেও পড়বে এটা নিশ্চিত হাইকমান্ড। তাই যাদের বহিষ্কার করা হয়েছে বা যারা মনোনয়নবঞ্চিত ছিলেন, তাদের সবাইকে নিয়ে কিভাবে কাজ করা যায়, সেই উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। অনেককেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আবেদনও করতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, বিএনপি এবার স্থানীয় নির্বাচনে কোনো কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় না বরং স্থানীয় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য, ত্যাগী এবং দলের প্রতি অনুগত নেতাদেরই মনোনয়ন দেয়া হবে। দলের প্রধান কৌশল হলো, ভোটের মাঠে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা একাধিক প্রার্থী এড়ানো, যাতে প্রধান বিরোধী পক্ষ এর সুযোগ নিতে না পারে। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে অনেক জেলাতেই বিরোধ রয়েছে। এগুলোকে জিইয়ে রেখে স্থানীয় নির্বাচনে ইতিবাচক ফলাফল অনেকটা কঠিন হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকারের জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেয়া এবং মাঠের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা একটি ‘টাইটরোপ ওয়াক’ বা সুতোয় হাঁটার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ। একদিকে বিরোধী দলগুলো ও সুশীলসমাজ দ্রুত স্থানীয় সরকার কাঠামোর জনপ্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনার দাবি তুলছে, অন্যদিকে মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো অর্থনৈতিক চাপ সামলানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা। এই অবস্থায় বিশাল নির্বাচনী ব্যয় মেটানো এবং মাঠের শান্তি বজায় রাখা এক বড় পরীক্ষা।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, স্থানীয় পর্যায়ে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা কমতে পারে। এ কারণে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন দল ও সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কার্যকর কৌশল নিতে হবে। এবার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রাধান্য পায় ব্যক্তির জনপ্রিয়তা, আঞ্চলিক সমীকরণ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা। অবশ্য বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন।

জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি নয়া দিগন্তকে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব আমরা স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দেব। গত দুই বছরে দেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার নাজুক পরিস্থিতির কারণে জনসেবা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অঙ্গীকার করা হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দেয়া হবে।