ভোটের মাঠে ‘গেম চেঞ্জার’ নারী ও নিম্নবিত্তরা

শহর ও গ্রামের প্রত্যাশায় ভিন্ন সুর

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

দেশের মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী (৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার)। পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ (৪.১৬ শতাংশ)। তবে এই বিশাল ভোটব্যাংক এবার আর কেবল প্রতীকের মোহে নয়, বরং জীবনমানের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা খুঁজে ভোট দিতে চাইছেন।

শহর বনাম গ্রাম : ভিন্ন প্রেক্ষাপট, অভিন্ন দাবি

শহর ও গ্রামের নিম্নবিত্ত ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম বা মানিকগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলের বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্ত নারীদের প্রধান উদ্বেগ ‘ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ’ এবং ‘নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম’। শহরের কর্মজীবী নারীরা নিরাপদ আবাসন এবং কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এমন প্রার্থীকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

চাঁদপুর, সিলেট বা পাবনার গ্রামীণ নারীদের কাছে বড় ইস্যু হলো ‘সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা’। তারা এমন প্রতিনিধি চাইছেন যারা বিপদে-আপদে পাশে থাকবে এবং গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত যাতায়াতের অনুন্নত রাস্তাঘাট ও ভঙ্গুর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে।

নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান : তিন প্রধান স্তম্ভ

সংবাদপত্র এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে যে, নিম্নবিত্ত ভোটারদের কাছে রাজনীতির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে তিনটি মৌলিক ইস্যু বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নিরাপত্তা : জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে নারী ভোটাররা ভোটের দিন এবং ভোট পরবর্তী সময়ে সঙ্ঘাতমুক্ত পরিবেশের দাবি জানাচ্ছেন।

কর্মসংস্থান : মানিকগঞ্জ ও পাবনার নারী ভোটাররা জানিয়েছেন, যারাই সরকার গঠন করুক, তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসংস্থান ও বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

স্বাস্থ্য : গ্রামীণ জনপদে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর আধুনিকায়ন এবং শহরের সরকারি হাসপাতালে দালালমুক্ত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবার দাবি এখন নিম্নবিত্তদের মুখে মুখে।

নারী প্রার্থী : অংশগ্রহণে জোয়ার, টিকিটে খরা

ভোটার তালিকায় নারীর জয়জয়কার থাকলেও প্রার্থিতার দৌড়ে তারা এখনো অনেকটা পিছিয়ে। আসন্ন নির্বাচনে ৩০০ আসনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার শতাংশের মধ্যে (প্রায় ১১০ জন)। যদিও বিএনপি ও গণ অধিকার পরিষদের মতো দলগুলো কিছু ক্ষেত্রে নারী প্রার্থীদের প্রাধান্য দিয়েছে, তবে জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কিছু দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি বলে প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে। নারী ভোটারদের অভিযোগ, দলগুলো মুখে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বললেও মনোনয়নের ক্ষেত্রে এখনো পুরুষ আধিপত্যই বজায় রেখেছে।

ভোটে নীরব বিপ্লবের পূর্বাভাস

সিলেট থেকে নোয়াখালী সর্বত্রই এখন নারী ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। অতীতে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সিদ্ধান্তে ভোট দেয়ার প্রবণতা থাকলেও, এবার নারীরা নিজস্ব বিচারবুদ্ধিতে ভোট দেয়ার অঙ্গীকার করছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবার জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি থাকবে এই নীরব নারী ভোটারদের হাতেই।

ভোটারদের দাবি একটাই নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি যেন কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে ভোটের পরও বাস্তবায়িত হয়।

নির্বাচন ও জনভাবনা : সাধারণ মানুষের আর্তনাদ ও প্রত্যাশা

তানজিলা আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে ভোটার হওয়া সত্ত্বেও সরকারি কোনো সাহায্য পাননি। অভাবের তাড়নায় মেধাবী মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়েছে, ছেলে এখন ছাপার কারখানায় কাজ করে। তার ভাষ্য কোনো সরকার আমাদের খাওয়ায় না, আমরা নিজেরাই নিজেদের সরকার। তিনি সকালে চা বিক্রি করে চাল কেনেন, সেই সাথে নিজের ওষুধও কেনেন। নির্বাচনের আগে সবাই বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও চাল বা অনুদান সাধারণ গরিবের বদলে বাড়িওয়ালাদের হাতেই বেশি পৌঁছায়। নির্বাচন অস্থিতিশীল হওয়ার ভয় থাকলেও তিনি নিজের নাগরিক অধিকার প্রয়োগে ভোট দিতে যাবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি তার তিক্ত অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, দালালি বা লবিং ছাড়া সরকারি ত্রাণ পাওয়া অসম্ভব। তার মতে : ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়ালে কাজের হাজিরা নষ্ট হয়, তাই কষ্ট করে হলেও কাজ করে চাল কেনাই তার কাছে সম্মানের। দোকান ভাঙচুর ও ৩০ হাজার টাকা দাবির মতো অরাজকতায় তিনি ভীত। তার প্রশ্ন সরকার যদি এভাবে চলে, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যাবে কই?

বিপরীত এক ইতিবাচক সুর শোনা গেছে পিরোজপুরের এই ব্যক্তির কণ্ঠে। তার এলাকায় বর্তমানে ত্রাণ সরাসরি গরিবদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। তিনি অনেক বছর পর ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত। তার মতে জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন না হলেও দেশে ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচার কায়েম হলে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ শান্তি পায়।

রিকশাচালক নাজিম উদ্দিন বেপারির তিন মেয়ে ও এক ছেলের বাবা। তিনি মনে করেন, বড়লোকদের ভাগ্য বদলালেও গরিবদের অবস্থা একই থাকে। তবে তার পর্যবেক্ষণ তীক্ষè : নিরাপত্তা থাকলে তিনি অবশ্যই ভোট দেবেন, কারণ সরকারের ভাগ্য নির্ধারিত হয় সাধারণ মানুষের ভোটেই। তিনি বিশ্বাস করেন, এবার যদি নতুন সরকার জনগণের সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ না নেয়, তবে তারা বেশিদিন টিকতে পারবে না। তিনি একটি ‘নতুন সূর্য’ দেখার আশায় আছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মো: জামাল হোসেন বলেন সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ফারাক দেখছেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে বিরোধী পক্ষ সকালে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। নির্বাচনে নিয়োজিত আনসার সদস্য বা পোলিং অফিসারদের প্রভাবিত করার একটা চেষ্টা হতে পারে। ভোটের ফলাফল নির্ধারণে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ মোকাবেলা করার ওপরই দলের জয়-পরাজয় নির্ভর করবে। তবে তিনি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর ওপর আলোর আভা দেখেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এক দিকে যেমন সরকারি অনুদান বণ্টনে অনিয়ম ও দুর্নীতির ক্ষোভ আছে, অন্য দিকে ভোট দেয়ার মাধ্যমে পরিবর্তনের এক ক্ষীণ আশাও আছে। নিম্নবিত্ত মানুষের মূল দাবি- ত্রাণ নয়, বরং ইনসাফ এবং শান্তিতে বাঁচার নিশ্চয়তা।