বিলুপ্তপ্রায় ধানের গোলা : উত্তম গোলদার

Printed Edition
বিলুপ্তপ্রায় ধানের গোলা : উত্তম গোলদার
বিলুপ্তপ্রায় ধানের গোলা : উত্তম গোলদার

গ্রামবাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক ধানের গোলা এখন বিলুপ্ত প্রায়। ‘গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ আর গোলা ভরা ধান।’ অথচ এক সময় সমাজের নেতৃত্ব নির্ভর করত কার ক’টি ধানের গোলা আছে এ হিসাব কষে। কন্যা পাত্রস্থ করতেও বরপক্ষের বাড়িতে ধানের গোলার খবর নিত কনেপক্ষের লোকজন, যা এখন শুধু কল্পকাহিনীতে শোনা যায়। এক সময় এমন প্রবাদ বাক্য থাকলেও বর্তমানে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা। এখন আর খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই ধানের গোলা চেনে না। অনেকেই নাম পর্যন্তও জানে না। তবে স্থানীয় ভাষায় ধানের ডোলও বলে।

পুরাতন সম্ভ্রান্ত পরিবারের একাধিক ব্যক্তির সাথে আলাপ করে ও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সময় মির্জাগঞ্জের সম্ভ্রান্ত পরিবার এমনকি উচ্চবর্ণের পরিবারে ও কৃষকদের প্রতিটি ঘরে ঘরে ছিল ধান বা চাল রাখার জন্য গোলা। এই গোলাটি বাঁশ ও বেত দিয়ে নিখুঁতভাবে গোল আকৃতি করে তৈরি হয়। গোলাটি ঘরের কোনো একটা জায়গায় রেখে সেখানে মজুদ করা হতো ধান। এক সময় এটি কৃষকদের অনেক প্রয়োজন থাকলেও কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। আরো জানা যায়, গ্রাম অঞ্চলে বাড়িতে বাড়িতে বাঁশ দিয়ে গোল আকৃতির তৈরি করা ধানের গোলা বসানো হতো উঁচুতে। গোলার মাথায় থাকত টিনের তৈরি মিসরের পিরামিড আকৃতির টাওয়ার। যা দেখা যেত অনেক দূর থেকে। বর্ষার পানি আর ইঁদুর তা স্পর্শ করতে পারত না। মই বেয়ে গোলায় উঠে তাতে ফসল রাখতে হতো। এই সুদৃশ্য গোলা ছিল সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারের ঐতিহ্য। সে সময় ভাদ্র মাসে কাদা পানিতে ধান শুকাতে না পেরে কৃষকরা ভেজা আউশ ধান রেখে দিতো গোলা ভর্তি করে। গোলায় শুকানো ভেজা ধানের চাল হত শক্ত। উপজেলার ছৈলাবুনিয়া গ্রামের সত্তরোর্র্ধ্ব বছরের কৃষক মো: হাফেজ বলেন, স্থানীয় কৃষকরা ধান বা চাল গুদামজাত করত না। আর গুদাম ছিল শহরে। সেই ধান বা চাল গোলা কিংবা ডোলায় রেখে দিত। আগের দিনে ছেলে পক্ষ বিয়ে করতে এলে মেয়ের বাড়িতে গুনে দেখত কয়টা ধানের গোলা আছে। যার বাড়িতে যত বেশি গোলা থাকত তার সম্মানও তত বেশি হতো। এই ঐতিহ্যবাহী গোলা এখন আর দেখা যায় না। বর্তমানে ইট-বালু ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি পাকা গুদাম ঘরে রাখা হচ্ছে ধান। এ ছাড়া একশ্রেণীর অসাধু মুনাফালোভী ফড়িয়া ও আড়ত ব্যবসায়ীদের দখলে ধান মজুদ করে রাখা হচ্ছে। এতে কৃষকরা তাদের ঐতিহ্য হারাতে বসেছেন। কিন্তু বর্তমানে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আধুনিক কলের লাঙ্গল যেন উল্টেপাল্টে দিয়েছে গ্রাম অঞ্চলের চালচিত্র। গোলায় তোলার মতো ধান আর তাদের থাকে না। গোলার পরিবর্তে কৃষকরা ধান রাখা শুরু করে বাঁশের তৈরি ক্ষুদ্রাকৃতি ডোলায়। ধান আবাদের উপকরণ কিনতেই কৃষকের বিস্তর টাকা ফুরায়।