পয়লা বৈশাখ ঘিরে ব্যস্ত কুমারপাড়া টিকে থাকার লড়াইয়ে মৃৎশিল্পীরা

Printed Edition
পয়লা বৈশাখ ঘিরে ব্যস্ত কুমারপাড়া টিকে থাকার লড়াইয়ে মৃৎশিল্পীরা
পয়লা বৈশাখ ঘিরে ব্যস্ত কুমারপাড়া টিকে থাকার লড়াইয়ে মৃৎশিল্পীরা

এম মাঈন উদ্দিন মিরসরাই (চট্টগ্রাম)

পয়লা বৈশাখকে সামনে রেখে কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের ছত্তরুয়া গ্রামের কুমারপাড়া। ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় মাটির তৈজসপত্র তৈরির কাজ, যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। তবে উৎসব ঘিরে এই ব্যস্ততার মধ্যেও টিকে থাকার কঠিন সংগ্রামে দিন পার করছেন এখানকার মৃৎশিল্পীরা।

সরেজমিন দেখা যায়, পরিবার-পরিজন মিলে কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ তৈরি করছেন পিঠা বানানোর খোলা, খেলনা, আবার কেউ শুকিয়ে রঙ-তুলির আঁচড়ে সেগুলোকে দিচ্ছেন আকর্ষণীয় রূপ। হাঁস, ঘোড়া, টিয়া, মাছ, দোয়েল পাখির আদলে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন খেলনা। পাশাপাশি মাটির ব্যাংক, মগ, গ্লাস, প্লেট, চায়ের কাপসহ নানা ধরনের ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরি হচ্ছে সমানতালে।

কুমারপাড়ার মনিবালা পাল বলেন, ‘এটা আমাদের বাপ-দাদার পেশা। তাদের দেখাদেখি আমরাও করে যাচ্ছি। কিন্তু যে পরিমাণ খরচ ও পরিশ্রম হয়, তাতে ঠিকমতো পোষায় না।’

স্থানীয় বাসিন্দা রাজন পাল জানান, মৃৎশিল্পের প্রধান উপকরণ এঁটেল মাটি এখন সহজে পাওয়া যায় না। দূর-দূরান্ত থেকে মাটি আনতে গেলে নানা ঝামেলায় পড়তে হয়। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও অন্যান্য আধুনিক পণ্যের দাপটে মাটির জিনিসের চাহিদা দিন দিন কমছে।

স্থানীয়দের মতে, এক সময় এই কুমারপাড়ায় ছিল মাটির পণ্যের রমরমা বাজার। এখন তা অনেকটাই অতীত। তবুও শেকড়ের টান ও পূর্বপুরুষের পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই শিল্প আঁকড়ে ধরে আছেন এখানকার মানুষ।

এক সময় পরিবারের নতুন সদস্যরাও এ কাজে যুক্ত থাকলেও এখনকার প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্প ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে।

ঐতিহ্যগতভাবে মাটির তৈজসপত্র ছিল গ্রামীণ জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক, সিরামিক, মেলামাইন ও স্টিলের পণ্যের আধিপত্যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এই শিল্প। বছরে ঈদ, পূজা-পার্বণ ও বৈশাখীমেলাকে ঘিরে কিছুটা চাহিদা বাড়লেও বছরের বাকি সময়টা কুমারদের কাটে চরম অনিশ্চয়তায়।

স্থানীয় বাসিন্দা অর্জুন পাল বলেন, ‘মাটির সঙ্কট এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। ঠিকমতো মাটি না পেলে এই পেশা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।’

মৃৎশিল্প সমিতির সভাপতি মৃদুল চন্দ্র পাল জানান, ‘কোনোভাবে বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছি। আগের মতো চাহিদা বা জৌলুশ নেই। শুধু বৈশাখ বা পূজার সময় কিছুটা বিক্রি বাড়ে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন।’

তিনি অভিযোগ করেন, একাধিকবার সরকারি সহায়তার জন্য আবেদন করা হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে এই পেশার সাথে জড়িতদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, ‘আমি যোগদানের পর লিখিত কোনো আবেদন পাইনি। আবেদন পেলে মাটির সঙ্কটসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করব।’

স্থানীয়দের দাবি, মৃৎশিল্প রক্ষায় প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা হলে কুমারপাড়ার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। অন্যথায়, ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে বাংলার প্রাচীন এই সংস্কৃতি।