নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরান যুদ্ধে যোগ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পশ্চিমা সামরিক জোট (ন্যাটো) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়ার বিষয় চিন্তা-ভাবনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন ভাবনার কথা জানিয়েছেন তিনি। দ্য টেলিগ্রাফ।
সাক্ষাৎকারে পশ্চিমা ওই সামরিক জোটকে ‘কাগুজে বাঘ’ হিসেবে অভিহিত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেয়ার বিষয়টি এখন পুনর্বিবেচনায় রয়েছে। হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়ার জন্য যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর যে দাবি ট্রাম্প করেছিলেন, তা মিত্র দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করার পর ইউরোপকে আর নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে না যুক্তরাষ্ট্র।
সঙ্ঘাত শেষ হওয়ার পর ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ নিয়ে তিনি আবার ভাববেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘ওহ হ্যাঁ, আমি বলব এটি পুনর্বিবেচনার ঊর্ধ্বে। আমি কখনোই ন্যাটোর মাধ্যমে প্রভাবিত হইনি। আমি সবসময় জানতাম তারা একটি কাগুজে বাঘ, আর পুতিনও তা জানেন।’
বিশ্ববাজারে ২০ শতাংশ তেল সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দিতে ন্যাটোর অংশীদাররা অনীহা প্রকাশ করেছে। তেহরান কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্যকরভাবে এই প্রণালী বন্ধ করে রেখেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এবং বৈশ্বিক মন্দার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘সেখানে (যুদ্ধে) না থাকার বিষয়টি ছিল আসলে অবিশ্বাস্য। আমি এ নিয়ে বড় কোনো জোরাজুরি করিনি। আমি শুধু বলেছিলাম। আমি খুব বেশি চাপ দিইনি। আমি মনে করি, এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে হওয়া উচিত ছিল।’
‘আমরা ইউক্রেনসহ সব জায়গায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলাম। ইউক্রেন আমাদের সমস্যা ছিল না। এটি একটি পরীক্ষা ছিল এবং আমরা তাদের পাশে ছিলাম, আমরা সবসময় তাদের পাশে থাকতাম। কিন্তু তারা আমাদের পাশে নেই।’
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকেও তিরস্কার করেছেন তিনি। ইরানবিরোধী মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকার করায় ব্রিটিশ নৌবাহিনী এই কাজের যোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। ব্রিটেনের যুদ্ধজাহাজ বহরের অবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কোনো নৌবাহিনীই নেই। আপনারা অত্যন্ত পুরনো এবং আপনাদের এমন বিমানবাহী রণতরী ছিল; যা কাজই করেনি।’
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষায় আরো ব্যয় করা উচিত কি না- জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, আমি তাকে কী করতে হবে তা বলতে যাচ্ছি না। তিনি যা খুশি করতে পারেন। তাতে কিছু যায় আসে না। স্টারমার শুধু ব্যয়বহুল বায়ুকল চান; যা আপনাদের জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী করে তুলছে।’
যুদ্ধে দীর্ঘ দিনের মিত্রদের অবস্থান নিয়ে হোয়াইট হাউজের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ন্যাটোকে ‘একতরফা রাস্তা’ হিসেবে অভিযুক্ত এবং মঙ্গলবার মার্কিন মিত্ররা তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেয়ায় তীব্র সমালোচনা করেছেন।
ট্রাম্পের সাক্ষাৎকারের কয়েক ঘণ্টা আগে ফক্স নিউজকে দেয়া এক বক্তব্যে রুবিও বলেন, ইরান যুদ্ধ শেষ হলে আমেরিকাকে ন্যাটোর সদস্যপদ নিয়ে ‘পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ করতে হবে। ‘আমি মনে করি দুর্ভাগ্যবশত এই সঙ্ঘাত শেষ হওয়ার পর আমাদের ওই সম্পর্ক নিয়ে আবার ভাবতে হবে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’
তিনি বলেন, ‘ন্যাটো যদি শুধু এমন হয় যে তারা আক্রান্ত হলে আমরা ইউরোপকে রক্ষা করব; কিন্তু আমাদের প্রয়োজনের সময় তারা আমাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অধিকার দেবে না, তাহলে তা খুব একটা ভালো ব্যবস্থা নয়। এমন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকা কঠিন।’
ট্রাম্প দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, রুবিও এসব মন্তব্য করায় তিনি ‘খুশি’। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ৯টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ সময় তিনি ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতির বিষয়ে জানাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার রাতে তিনি বলেছেন, ইরানের সাথে যুদ্ধ ‘দুই সপ্তাহ, সম্ভবত তিন সপ্তাহের’ মধ্যে শেষ হতে পারে। তিনি বলেন, এই যুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।
গত মাসে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথ হামলার পর মার্কিনিরা ন্যাটোভুক্ত দেশকে এই সংঘাতে যুক্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ন্যাটো এতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এতে করে সংস্থাটির ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন ট্রাম্প। ১৯৪৯ সালে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটো গঠিত হয়। বর্তমানে এই জোটের সদস্য ৩২টি। সামরিক এ জোটের মূল লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ন্যাটোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো এর চার্টারের ‘আর্টিকেল ৫’।
এই আর্টিকেল অনুযায়ী, ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা জোটভুক্ত সব দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত দেশটিকে রক্ষায় অন্য সব সদস্য রাষ্ট্র সামরিক সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য থাকবে। ন্যাটোর ইতিহাসে ২০০১ সালে প্রথম ও শেষবার এ আর্টিকেলটি কার্যকর করা হয়। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার পর ন্যাটোর আর্টিকেলটি কার্যকর করে আফগানিস্তানে হামলা চালানো হয়।



