বিশেষ সংবাদদাতা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তবে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কারিগরি ও জটিল হওয়ায় হিসাব-নিকাশ করে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এ কথা বলেন।
পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার সময় সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘হ্যাঁ, শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে। তবে আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় প্রথমে আছেন আমানতকারীরা। এই ব্যাংকগুলোকে ৪২ হাজার কোটি টাকা কেন দেয়া হচ্ছে? কারণ প্রথমে আমানতকারীরা সবাই তাদের টাকা ফেরত পাবেন। এর পর শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়টি দেখা হবে।’
শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রক্রিয়াটি চ্যালেঞ্জিং উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়টি পুরোপুরি টেকনিক্যাল। ব্যাংকগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) নেতিবাচক হয়ে গেছে। কারিগরি বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তোলেন, যারা শেয়ার কিনেছেন তারা তো ব্যাংকের মালিক, তাদের কেন ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে? কিন্তু আমি বলেছি, তারা হয়তো বাজারের ইতিবাচক সিগন্যাল দেখে শেয়ার কিনেছিলেন। তাই তাদের বিষয়টি দেখা দরকার এবং কতটুকু, কী করা যায়, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
ক্ষতিপূরণের সম্ভাব্য মডেল সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ কিভাবে দেয়া হবে তার একটি মডেল তৈরি করতে সময় লাগবে। ধরুন, কেউ অনেক টাকার শেয়ার কিনেছেন, তাকে হয়তো আংশিক শেয়ার দেয়া হতে পারে অথবা বাকিটুকু অন্য কোনো উপায়ে ক্ষতিপূরণ দেয়া হতে পারে। পুরো বোঝা তো শেয়ারহোল্ডাররা বইতে পারেন না। এ বিষয়ে পরবর্তী অর্থমন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’
ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শুধু এককালীন কোনো সিদ্ধান্তে এই খাতের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন। একই সাথে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।’
নিজেকে ১০০ তে ৭০ নম্বর দিতে চান অর্থ উপদেষ্টা
এ দিকে, অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিজের কাজের মূল্যায়নে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ নম্বর দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, অনেক উদ্যোগ শুরু করা গেলেও সব কিছু শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও জনগণের স্বার্থে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছাড়াই কাজ শুরু করা হয়েছে, সেটিই বড় অর্জন।
এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আমি খুব প্র্যাগমেটিক মানুষ। নিজেকে ১০০ নম্বর কেন দেবো? আমাদের অনেক ইচ্ছা ছিল, অনেক কাজ শুরু করেছি, কিন্তু সব শেষ করে যেতে পারিনি। সে কারণেই আমি নিজেকে ৭০ বা ৮০-এর বেশি দিতে রাজি নই।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সময়ে অর্থনীতি পরিচালনা করা সহজ ছিল না। কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও ব্যাংক খাতের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেবল আইনে গভর্নরের মর্যাদা বাড়ালেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। অপারেশনাল সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা জরুরি। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চার বছর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বড় কোনো সরকারি হস্তক্ষেপের মুখে পড়েননি।
ব্যাংকিং খাতকে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ, আস্থাহীনতা ও সীমিত ক্রেডিট সাপ্লাই অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। যদিও আমানত কিছুটা বেড়েছে, তবু পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি বড় বাধা
অর্থ উপদেষ্টার মতে, অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান। ব্যবসা ও শিল্প সচল না হলে কর্মসংস্থান আসবে না। কর্মসংস্থান না হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে না।
তিনি আরো বলেন, মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যার সাথে সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় জড়িত।
অর্থপাচার : তথ্য আছে, প্রক্রিয়া জটিল
অর্থপাচার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, কোন কোন দেশে, কারা অর্থ পাচার করেছে, সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বলা কঠিন।
তিনি জানান, বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের মতো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, বেজটা তৈরি হয়েছে। পরবর্তী সরকার যদি সিরিয়াস হয়, তা হলে এই তথ্যগুলো কাজে লাগাতে পারবে।
ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতি আহ্বান
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, নতুন করে সব আবিষ্কার করার দরকার নেই। আমরা যা করেছি, সেটাকে কনসলিডেট করুন। ভালো জিনিসগুলো ধরে রাখুন। সবচেয়ে জরুরি হলো সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো।
নিজের জবাবদিহিতা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তিনি অনেক আগেই সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতার আশঙ্কাও দেখছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সমালোচনা করবেন, কিন্তু পুরো চিত্রটা দেখবেন। ১৭-১৮ মাসে কিছুই করা হয়নি, এমন বলা ঠিক নয়। অনেক কাজ শুরু হয়েছে, যেগুলোর ফল সামনে দেখা যাবে।



