হাবিবুল বাশার
রমজানের দিনপঞ্জি যত ছোট হয়ে আসছে, রাজধানীর রাজপথে ততই বাড়ছে উৎসবের উন্মাদনা। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঢাকার বিপণিবিতানগুলো এখন আলোকোজ্জ্বল। তবে এই ঝকঝকে আলোকসজ্জার অন্তরালে মধ্যবিত্তের মনে চলছে এক নীরব হিসাব-নিকাশ। বড় বড় শপিং মলের কাঁচঘেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আভিজাত্যকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ মানুষের পায়ের ধুলো জমছে নিউমার্কেট, মৌচাক, আয়েশা কমপ্লেক্সের মতো ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে। এখানে পণ্যের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে আবেগ আর সাধ্যের মধ্যকার এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন।
স্মৃতির গহিন থেকে আধুনিক মৌচাক : ঢাকার মালিবাগ-মৌচাক মোড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মৌচাক মার্কেটটি কেবল একটি দালান নয়, বরং এই শহরের অগণিত নারীর ঈদ স্মৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ষাটের দশকের শেষ ভাগে শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম জহিরের হাত ধরে যখন এর পথচলা শুরু হয়, তখন থেকেই এটি হয়ে ওঠে শাড়ি আর প্রসাধনীর আস্থার প্রতীক। বিবর্তনের ধারায় আজ মৌচাককে ঘিরে গড়ে উঠেছে ফরচুন, আনারকলি কিংবা সেন্টার পয়েন্টের মতো আধুনিক স্থাপত্য। কিন্তু ঐতিহ্যের সেই পুরনো মৌচাক আজও তার আবেদন হারায়নি। আগেকার দিনে মানুষ এখানে এসে থান কাপড় কিনে দর্জিবাড়িতে লাইন দিত, আর আজ সেই জায়গা দখল করেছে ঝকঝকে তৈরি পোশাক। তবুও মৌচাকের অলিগলিতে আজও সেই আদি কেনাকাটার ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
পণ্য ও পছন্দের বৈচিত্র্য : চলতি বছরের ঈদবাজারে সরেজমিনে দেখা গেছে, নারীদের পছন্দের তালিকায় এবারো ‘রেডিমেড’ পোশাকের জয়জয়কার। মৌচাক ও আনারকলি এলাকার গলিগুলোতে যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা তামিমা ইসলাম বলেন, ছুটির দিনে মার্কেটে আসা মানেই যুদ্ধ করা। কিন্তু এখানে এক ছাদের নিচে জুতো থেকে অলঙ্কার, সব পাওয়া যায় বলে কষ্ট সার্থক হয়।
অন্য দিকে, পুরুষদের ঈদ সাজের প্রধান অনুষঙ্গ পাঞ্জাবির জন্য মালিবাগের আয়েশা শপিং কমপ্লেক্সের জুড়ি মেলা ভার। ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে নজরকাড়া পাঞ্জাবি মিলছে এখানে। সেন্টার পয়েন্ট ও সুবাস্তু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শিশুদের পোশাকের দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। বাহারি লেহেঙ্গা থেকে শুরু করে ছোট্ট সোনামণিদের জন্য আরামদায়ক সুতি পোশাকের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি।
মূল্যস্ফীতির চাপে নিষ্পেষিত মধ্যবিত্ত : উৎসবের আমেজ থাকলেও বাজারের মুদ্রাস্ফীতি ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ফরচুন শপিং মলে মেয়ের জন্য লেহেঙ্গা কিনতে আসা রাকিব হাসান ােভের সাথে জানালেন, গত বছর যে পোশাক দুই হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এবার তার দাম চাওয়া হচ্ছে চার হাজার টাকার ওপরে। বাজেটের সাথে পছন্দের মিল ঘটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতির কারণে মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ এখন সুসজ্জিত বিপণিবিতান ছেড়ে ফুটপাতমুখী হচ্ছে। গার্মেন্ট কোয়ালিটি ম্যানেজার রকিবুল ইসলামের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বেড়েছে, তাতে টিকে থাকার লড়াইয়ে ফুটপাতই এখন অনেক মধ্যবিত্তের শেষ আশ্রয়স্থল।
বিক্রেতাদের পাল্টা যুক্তি : দামের এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ে বিক্রেতাদের দাবি আবার ভিন্ন। মৌচাক মার্কেটের মনে রেখো শাড়ীজ-এর ব্যবস্থাপক কাউছারের মতে, কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অনেক ক্রেতা ভাবছেন আমরা মাত্রাতিরিক্ত লাভ করছি, কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা পুঁজি তুলতেই হিমশিম খাচ্ছি। ক্রেতা ধরে রাখতে অনেক সময় নামমাত্র লাভে বা কেনা দামেই পণ্য ছেড়ে দিতে হচ্ছে। নিউমার্কেটের বিক্রেতা আশরাফুল হক মনে করেন, অল্প লাভ, বেশি বিক্রি এই সনাতন ব্যবসায়িক দর্শনেই তারা আজও ক্রেতাদের হৃদয়ে জায়গা ধরে রেখেছেন।
একনজরে ঈদ বাজারের বাজেট : নারীদের পরিধেয় : রেডিমেড থ্রি-পিস ও ওয়ান-পিস (এক হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা), আভিজাত্যপূর্ণ শাড়ি (দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা)।
পুরুষদের সাজ : বৈচিত্র্যময় পাঞ্জাবি (৭০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা), বাহারি কটি (৫০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা)।
শিশুদের জগৎ : রঙিন পোশাক ও লেহেঙ্গা (৩০০ থেকে চার হাজার ৫০০ টাকা)।
আনুষঙ্গিক : মানসম্মত জুতা (৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা) ও চামড়ার ব্যাগ (এক হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা)।
রমজানের শেষের দিকে এসে এই কেনাকাটা এখন তুঙ্গে। মৌচাকের আনারকলি সবখানেই ফুটে উঠছে এক খণ্ড বাংলাদেশ। যেখানে উচ্চবিত্তের বিলাসিতা নেই, আছে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন আর সীমিত আয়ে আপনজনকে খুশি করার এক প্রাণান্তকর চেষ্টা। সামনের দিনগুলোতে ভিড় আরো বাড়বে এবং কেনাকাটার এই আনন্দধ্বনি মধ্যরাত ছাপিয়ে ভোরের আলোয় মিশে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা এই বাণিজ্যিক জনপদগুলোর।



