বর্তমান ডিজিটালাইজেশনের যুগে সাইবার নিরাপত্তা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দেশের সরকারি ও বেসরকারি তথ্য পরিকাঠামো এখন সাইবার হুমকির মুখোমুখি। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট ও সিস্টেম হ্যাকারদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু, যা বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং ও যোগাযোগের মতো জরুরি পরিষেবা ব্যাহত করতে পারে। দেশের বাইরে থেকে হ্যাকাররা সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে হামলার চেষ্টা করেছে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে। এতে বোঝা যায় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সাইবার নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে। পুলিশ সদর দফতরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার জন্য পুলিশ বিভাগে কিছু জনবল নিয়োজিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা খুবই দুর্বল। এ খাতে যে পর্যাপ্ত জনবল দরকার তা নেই। অথচ সাইবার ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রত্যেকটি বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে জনবল বাড়ানো দরকার।
সূত্র জানায়, পুলিশের সাইবার ইউনিট বলতে সিআইডি ও ডিএমপিতে দু’টি শাখা রয়েছে, যা বর্তমান প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। বর্তমানে সাইবার ইউনিটে সরকার কর্তৃক জনবল মঞ্জুরিও নেই। রাষ্ট্রের সক্ষমতা না থাকায় তৃণমূল পুলিশ সদস্য থেকে এই ইউনিটের কাজ চলমান রয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, সাইবার নিরাপত্তায় স্বতন্ত্র ইউনিট বা জনবল না থাকায় চার মাস আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় পুলিশের প্রতিটি থানায় পাঁচ থেকে ছয়জনের একটি করে টিম গঠন করে দুই হাজার লোকের জনবলের কাজ শুরু করার জন্য অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই টিমে একজন করে এএসপি ও একজন পরিদর্শক দায়িত্ব পালন করবেন। অপর দিকে বিভাগীয় এবং জেলায় একটি করে স্থায়ী অফিস নির্ধারণে অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
এর আগে ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকাররা সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনাটি ছিল বিশ্বের বৃহত্তম সাইবার ডাকাতিগুলোর একটি। তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমানের গাফিলতিতে এবং পরে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক ডিএসসিসির মেয়র ফজলে নূর তাপসের কারসাজিতে তদন্তের মোড় ভিন্ন দিকে যেতে থাকে। বর্তমানে এই মামলাটির তদন্ত প্রায় চূড়ান্ত হলেও রিপোর্ট জমা দেয়ার তারিখ বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। এর পর থেকেই সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে কাজ করতে গিয়ে কয়েকটি সংস্থা ২০২৩-২৪ সালে এক রিপোর্টে জানিয়েছে, দেশের ব্যাংক খাতে অন্তত ১৩ ধরনের সঙ্ঘবদ্ধ সাইবার হামলা, যেমন- অ্যাডভান্সড পারসিসট্যান্ট থ্রেট (এপিটি), রথ্যানসমওয়্যার, ম্যালওয়্যার এবং তথ্য চুরির (ডাটাব্যাচ) ঘটনা তারা শনাক্ত করে। তারা তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি হিসেবে সরকারি দফতরের ওয়েবসাইটগুলো নিয়মিত মনিটরিং না করা এবং দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহারের কারণে তথ্য ফাঁসের ঘটনা বাড়ছে বলে জানিয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা বলছেন, সাইবার অপরাধীরা ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে ফিশিং বা ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে অর্থ লুট করছে। একই সাথে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন উগ্রপন্থী ও স্বার্থান্বেষী হ্যাকার গ্রুপ বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। এ ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনা ব্যাপক হারে বেড়েছে।
র্যাব সূত্র জানায়, গত দুই বছরে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন অনেকে। ওই সময়টায় র্যাবের কাছে অনেক অভিযোগ জমা পড়ে। শুধু ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেই নয়, কারো কারো চরিত্র নিয়েও অনেকে ব্ল্যাকমেইল করেছে। এই তালিকায় ব্যবসায়ী এবং সরকারি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাও রয়েছেন।
সর্বগ্রাসী ইন্টারনেটভিত্তিক অপরাধ : র্যাব, পুলিশ ও সিআইডির গোয়েন্দা বিভাগের সাইবার ইউনিট সূত্র জানায়, সবার হাতে এখন স্মার্ট ফোন। দেশের সবখানে এখন তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। এই ‘ডিজিটাল বিপ্লবের’ যেমন অনেক ইতিবাচক দিক দেখা যাচ্ছে, তেমনই উল্টো দিকে ভয়ানক পরিস্থিতিও দেখা যাচ্ছে সাইবার দুনিয়ায়। বিশেষ করে দেশ যত ডিজিটাল হচ্ছে সাইবার সন্ত্রাসী বা অপরাধীদের সংখ্যা ততই বাড়ছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কেউই বাদ পড়ছেন না সাইবার সন্ত্রাসীদের হাত থেকে। গুজব, ব্যক্তিগত আক্রোশে হেয় করা, প্রতারণা, জুয়া, রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচারণা, হ্যাকিং, ‘হানি ট্রাপ’, অনলাইন ব্যবসার নামে প্রতারণা, পর্নোগ্রাফি, বিভিন্ন গণমাধ্যমের ফটো কার্ড ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোসহ মাদক কারবারের মতো গুরুতর অপরাধ পরিচালনা হচ্ছে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে। কিন্তু এসব অপরাধ-অপকর্ম রুখতে সেভাবে শক্তভাবে গড়ে ওঠেনি কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা। এমনকি উগ্রবাদী সংগঠনগুলোও তৎপর সাইবার জগতে। সাইবার প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকায় মনের অজান্তেই অনেকে জড়িয়ে পড়েন সাইবার অপকর্মে। এমন অনেক অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী নয়া দিগন্তকে বলেন, সম্প্রতি পাশের দেশের এক নারীর সাথে ফেসবুকে বন্ধুত্ব হলে একপর্যায়ে ভিডিও কলে ঘনিষ্ঠ আলাপ শুরু হয়। সেই ভিডিও রেকর্ড করে আমাকে ইনবক্সে দিয়ে সেটি পরিবার ও স্ত্রীকে পাঠানোর হুমকি দিয়ে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় ওই নারী।
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার মামলায় আসামি গ্রেফতার ও আদালতে প্রমাণের ক্ষেত্রে আমরা অনেক দুর্বল। তাই আলাদাভাবে সাইবার পুলিশ ইউনিটের গঠন না করলে এ জাতীয় অপরাধ কমবে না।
জানা গেছে, এ বিষয়ে সচেতনতার ক্যাম্পেইন কিংবা পুলিশের কয়েকটি ইউনিট ছোট পরিসরে কাজ করলেও তেমন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ সাইবার অপরাধের যে ব্যাপকতা সে তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মতৎপরতার ব্যাপকতা কম। তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নিরাপদ সাইবার স্পেস, সাইবার অপরাধ দমন ও অপপ্রচার ঠেকাতে একটি আলাদা ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠন করবে।
সাইবার পুলিশ ইউনিটের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের (পুলিশ ও এনটিএমসি অনুবিভাগ) সূত্র জানায়, সাইবার নিরাপত্তায় ঝুঁকি কমাতে শক্তিশালী একটা ইউনিট তৈরি করতে প্রস্তাবের খসড়া আছে। মন্ত্রীসহ একটা মিটিং ও ওয়ার্কশপ হবে। প্রস্তাবটা এখনো অনুমোদন হয়নি। অনুমোদন হলে আমরা কাজ শুরু করব। কমিটি অ্যাগ্রি করবে, জনপ্রশাসন অ্যাগ্রি করবে, অর্থ অ্যাগ্রি করবে। নতুন করে একটা ইউনিট করা, পদ সৃষ্টি করা, সাংগঠনিক কাঠামো করা, লোকবল ও পরিবহনসহ নানা বিষয় থাকে। এরপর ধাপে ধাপে অনেক প্রসিডিউর আছে। নতুন ইউনিট গঠন তো এক বছরে হবে না, আনুমানিক এক থেকে দেড় বছর লাগবে।
এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সাইবার অপরাধের দুটো ধরন আমরা দেখতে পাই। একটা হলো, ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যটি হচ্ছে পেশাদার অপরাধী চক্র। যাদের বহু রূপের পরিচয় রয়েছে। প্রথম ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা আমাদের পুলিশের কিছুটা আছে। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমরা সমানভাবে দক্ষতা অর্জন করতে পারিনি। সাইবার যুগে অপরাধের যে পরিবর্তন ঘটছে তাতে অনেক আগেই আলাদা ইউনিট গঠন করা প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে এআইয়ের যুগে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক তরুণ-তরুণী মৃত্যুর দিকে ঝুঁকছে। তাই দ্রুত স্বতন্ত্র সাইবার ইউনিট গঠন করে অপপ্রচারকারী, গুজবকারীদের ধরতে পুলিশের এই বিশেষ ইউনিট বা সাইবার ইউনিট জরুরি।
এ বিষয়ে জানতে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহদাত হোসেনের মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।


