ডাকসু আলোচনাসভায় বক্তারা

গণরায় উপেক্ষা করলে ছাত্রসমাজ আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনগণের মতামত, গণভোটের রায় এবং জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। বক্তারা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা টেকসই করতে হলে জনআকাক্সক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, জনগণের গণভোটে প্রকাশিত মতামতকে অবহেলা করা হলে ছাত্রসমাজ আবারো আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘গণভোট ও অধ্যাদেশ : ছাত্রনেতৃত্বের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন বক্তারা। এদিন বিকেলে ডাকসু প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্ব পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি ।

আলোচনায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ও রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের নেতারা অংশ নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর করা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলনের ইঙ্গিত দেন।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, জনমতের বিপরীতে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ছাত্রসমাজ আবারো জনগণকে সাথে নিয়ে রাজপথে নামবে।

তিনি আরো দাবি করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সাথে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না এবং সংস্কার প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের সভাপতি আব্দুল আজিজ বলেন, ‘প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে যে গণরায় এসেছে, সেটি জাতির আমানত। এটিকে উপেক্ষা করা জনগণের সাথে প্রতারণার শামিল।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি মো: রিয়াজুল ইসলাম বলেন, গণভোট জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন এবং এটি অবমূল্যায়ন করা হলে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য হুমকি। তিনি বলেন, জনমতকে উপেক্ষা করে কোনো শক্তি নতুন স্বৈরাচারী কাঠামো তৈরি করতে চাইলে ছাত্রসমাজ তা প্রতিহত করবে।’

বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি নাজমুল হাসান অভিযোগ করেন, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি তাদের পূর্বের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে। তিনি সংসদে দ্রুত অধ্যাদেশ আনার দাবি জানান। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের সভাপতি মুহাম্মদ রায়হান আলী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।

তিনি বলেন, “আমরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব থেকে কেউ যেন সরে না যায়।”

বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স ইতিহাসের বিভিন্ন ধাপ টেনে বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, তা বারবার ব্যাহত হয়েছে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে জনগণের অধিকার রক্ষার পথে ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের দাবি।

ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের সহসভাপতি খায়রুল আহসান মারজান বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীতে সেই ঐক্য ধরে রাখা যায়নি। তিনি বলেন, ‘যদি ছাত্রসমাজ তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তবে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হবে।’ বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্রসমাজের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, গণভোটে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রমাণ করে তারা পরিবর্তনের পক্ষে। তিনি গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের জিএস মো: মাজহারুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের ত্যাগকে দলীয় স্বার্থে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে। তিনি বলেন, ‘গণভোটের মাধ্যমে জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সেটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।’

জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান বিএনপির নীতিগত অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করে বলেন, দলটির ঘোষিত সংস্কার অবস্থানের সাথে বর্তমান বক্তব্যের অসামঞ্জস্য রয়েছে। তিনি বলেন, ‘জনগণের ৭০ শতাংশের মতামত উপেক্ষা করা গণতান্ত্রিক চেতনার অবমাননা।

সভাপতির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, জুলাই পরবর্তী সময়ে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিবর্তন হয়নি। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘যে সংস্কারের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়েছে, এখন সময় এসেছে তা বাস্তবায়নের। জনআকাক্সক্ষাকে উপেক্ষা করা হলে নতুন সঙ্কট সৃষ্টি হবে।’

তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে উপহাস করা হয়েছে, যা দুঃখজনক। রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করে বলেন, জনগণের ম্যান্ডেট উপেক্ষা করার সুযোগ নেই এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পথেই এগোতে হবে।

অনুষ্ঠানে ডাকসুর বিভিন্ন সম্পাদক ও কার্যনির্বাহী সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। শেষে অতিথিদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।