এস আলমের পাচার করা টাকায় সাইপ্রাসে গড়ে তোলা বাড়ি জব্দ

বাংলাদেশের অনুরোধে সাইপ্রাসের অর্থ পাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত ইউনিটের আদালতে জব্দের আবেদন

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও ব্যাংক লুটের অন্যতম হোতা এস আলম ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন থাকা সাইপ্রাসে দুই তলা একটি ভবন জব্দের আদেশ দিয়েছেন স্থানীয় আদালত। আবাসিক ভবনটি সাইপ্রাসের পারেক্লিসিয়া নামের একটি গ্রামে। ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থ পাচার তদন্তের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের অনুরোধে নিকোসিয়া জেলা আদালত এই আদেশ দেন। সাইপ্রাসের গণমাধ্যম সাইপ্রাস মেইল সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

দেশের ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটের পর পাঁচার করে এস আলম ওই অর্থে গড়ে তুলেছেন সাইপ্রাসে বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ। দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে এস আলম ও তার পরিবারসহ অধীনস্তদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ২৭টি মামলার বর্তমানে তদন্ত চলছে।

বাংলাদেশের অনুরোধের পর সাইপ্রাসের অর্থ পাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত ইউনিট আদালতে একটি আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ মে আদালত ওই আদেশ দেন। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই অনুরোধ জানানো হয়েছিল।

সাইফুল আলম এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। তিনি ২০১৬ সালে নাগরিকত্ব বিনিয়োগ কর্মসূচির (গোল্ডেন পাসপোর্ট স্কিম নামে পরিচিত) মাধ্যমে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব পান। সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়া নথি অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি কোম্পানি নেটওয়ার্কের কার্যক্রম এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন বাংলাদেশের তদন্তকারীরা। এই অনুসন্ধানে প্রতারণামূলক ঋণ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগগুলো অন্তর্ভুক্ত।

তবে গোল্ডেন পাসপোর্ট স্কিমের আওতায় এস আলম সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব পেলেও পরে তা বাতিল করা হয়।

তবে, এই নাগরিকত্ব প্রদান কর্মসূচির কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে গঠিত ‘নিকোলাটোস কমিটি’র তদন্ত প্রতিবেদনে এস আলমের নাম নেই।

সাইপ্রাসের গণমাধ্যম সাইপ্রাস মেইলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্পত্তি জব্দের আদেশ জারি হওয়ার একদিন পর, বাংলাদেশি একটি আদালত এস আলম এবং তার দশ আত্মীয় ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদ- দিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে দেয়া প্রায় ছয় মিলিয়ন বা ৬০ লাখ ইউরোর সমপরিমাণ একটি ঋণের মামলায় এই দ- দেওয়া হয়।

সাইপ্রাস মেইল লিখেছে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অর্থায়নের উদ্দেশ্য ছিল ১৩৪টি বাস কেনা। কিন্তু পরে কোনো বাসই কেনা হয়নি।

বাংলাদেশ থেকে সাইপ্রাসে পাঠানো নথির তথ্য অনুযায়ী, এস আলমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন কোম্পানি ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছিল। বর্তমানে সে সংক্রান্ত অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সাইপ্রাসকে দেয়া আইনি অনুরোধে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এসব ঋণের একটি বড় অংশ পরে খেলাপি হয়ে গেছে। ঋণ থেকে প্রাপ্ত তহবিলগুলো বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের কোম্পানি নেটওয়ার্ক এবং আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছিল কি না তদন্তকারীরা তা খতিয়ে দেখছেন।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, এই মামলাটিতে প্রায় ৮ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগ আছে। বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষের ধারণা, তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সম্পদ সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশে থাকতে পারে।

সাইপ্রাসে নিবন্ধিত কোম্পানি ‘অ্যাক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনাল’কে ঘিরেও তদন্ত হচ্ছে। ২০১৬ সালে এটি কেনার পর এস আলম নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। তদন্তাধীন তহবিল স্থানান্তরের মতো আর্থিক লেনদেনে এই কোম্পানি ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, বাংলাদেশের তদন্তকারীরা সেটি খতিয়ে দেখছেন।

আদালতের নথিতে সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং জার্সিতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কোম্পানি ও ট্রাস্টের একটি নেটওয়ার্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা এখন এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো এবং তাদের আর্থিক কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন।