বিশেষ সংবাদদাতা
বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর ব্যবসার লাইসেন্স নিয়েছেন এমন প্রায় দুই হাজার পাঁচ শ’ রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও তাদের অতীত পারফরম্যান্স খুঁজতে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নেমেছে। সারা দেশে প্রায় এক মাস ধরে শুরু হওয়া অনুসন্ধানকার্যক্রম এখন প্রায় শেষের দিকে রয়েছে। অনুসন্ধানের সময় অনেক মালিকের লাইসেন্সের ঠিকানা অনুযায়ী গিয়েও গোয়েন্দারা অফিসের ঠিকানা খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মূলত জনশক্তি রফতানির ব্যবসায় প্রতারণা বন্ধ ও শৃঙ্খলা ফেরাতেই নতুন সরকার এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন বলে একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নেয়া মালিকদের মধ্যে আসলেই কতজন আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের দোসর হিসেবে ঘাপটি মেরে রয়েছেন সেটিও খুঁজে দেখা হচ্ছে।
এদিকে মালয়েশিয়ার স্থগিত শ্রমবাজারটি কবে নাগাদ খুলতে পারে, সেই জট এখনো না খুললেও দুই দেশের সরকার সংশ্লিষ্টরা ভেতরে ভেতরে সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে নানাভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও মালয়েশিয়া সরকার শুরু থেকেই বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের কাছে বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছেন যে সীমিত রিক্রুটিং এজেন্সির (সিন্ডিকেট) মালিকদের ছাড়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী আমদানি করতে আগ্রহী নয় তারা। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার তাদের সেই আবদার নাকচ করে বলা হচ্ছে ওপেন ফর অল পদ্ধতিতেই বাংলাদেশ শ্রমবাজার খুলতে আগ্রহী। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বায়রার প্রায় প্রতিটি সদস্যের ঢাকার অফিস এবং গ্রামের বাড়িতে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সরেজমিন নানা বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। এ সময় তারা তাদের ব্যবসারকার্যক্রম দেখার পাশাপাশি তাদের মধ্যে কোন মালিক আগে কোন কোন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের ছিলেন সেটিও আশপাশের লোকজনের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করছেন। তবে হঠাৎ করে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ায় তাদের কারো কারো মধ্যে প্রশ্ন জাগছে, কেন এবং কী কারণে এসব করা হচ্ছে?
গত সপ্তাহে একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন সদস্য নয়া দিগন্তকে এ প্রসঙ্গে শুধু বলেছিলেন, রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের ঢাকার অফিস পরিদর্শন করা ছাড়াও যাদের গ্রামের ঠিকানায় অফিসের কার্যক্রম চলছে সেগুলোর বিষয়ে আমরা খোঁজ খেবর নিচ্ছি। তদন্তে যা পাবো সেটি প্রতিবেদনে তুলে ধরবো। এ সময় তিনি বলেন, আমার এরিয়ায় যেসব এজেন্সির মালিকের ঠিকানা দেয়া আছে, সেগুলোর খোঁজ নিয়েছি। এর মধ্যে শতকরা ৮- ১০ ভাগ এজেন্সির অফিসের ঠিকানা কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে ওই সব অফিস খুঁজে পাচ্ছি না! আশা করছি চলতি সপ্তাহেই তদন্ত শেষ করতে পারব।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগে ঢাকার কাকরাইলের রিক্রুটিং এজেন্সি ফেয়ার ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী আনিছুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার অফিসে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এখনো আসেননি। তবে আমার গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় গিয়েছেন। তারা আমার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গেছেন, যা জানতে চেয়েছেন আমি তাদেরকে সেগুলো বলেছি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কী কারণে সব রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের অফিস গোয়েন্দারা পরিদর্শন করছেন সেটি আমার কাছে মুখ্য নয়। সরকার চাইছে তাই আমরাও তাদেরকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছি। হতে পারে ব্যবসায় শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্য এটি করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো অফিসের মালিকের কাছে শুনছি, কোন কোন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ফ্যাসিস্টদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত সেটিও গোয়েন্দারা তথ্য নিচ্ছেন।
বায়রার হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে মোট দুই হাজার ৪’শ ৯২টি রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে। এর মধ্যে থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কাজ করতে পারে এমন ‘কিন ইমেজের’ ৪২৪টি রিক্রুটিং এজেন্সির নামের তালিকা আগেই মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয়েছে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, যে তালিকাটি মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছে সেখানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে চিহ্নিত বেশ কিছু এজেন্সি মালিকের নামও রয়েছে।
সচেতন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা কোনোভাবেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট করে ব্যবসা করতে দেয়ার পক্ষে নয়। প্রয়োজনে তারা ওই সব অফিসের বিরুদ্ধে কঠিন আন্দোলনে নামবেন বলেও হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। এই প্রসঙ্গে গুলশানের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নয়া দিগন্তকে বলেন, সিন্ডিকেট করে নয়, দুই সরকারের মান সম্মান রক্ষা হবে, এমন একটা ফর্মুলায় শ্রমবাজারটি দ্রুত উন্মুক্ত হোক। এটি আমি চাই। কারণ শ্রমবাজারটি বন্ধ থাকলে অন্যান্য দেশ সেখানকার বাজার দখল করে নেবে। কাজী এয়ার ইন্টারন্যাশনালের মালিক কাজী মফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, দুই সরকার আলোচনা করে যে প্রক্রিয়ায় হোক মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজারটি আগে খুলুক। আমরা ব্যবসায়ীরা চাই ব্যবসা করতে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, যে এক শ’ রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট করেছিল তাদের লাইসেন্স নবায়নের কাজ স্থগিত রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দেয়া হয় বলে জানা গেছে।



