বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ

Printed Edition
বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলা হচ্ছে পচা সবজি ও আবর্জনা। এতে দূষিত হচ্ছে পানি ও পরিবেশ : নাসিম সিকদার
বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলা হচ্ছে পচা সবজি ও আবর্জনা। এতে দূষিত হচ্ছে পানি ও পরিবেশ : নাসিম সিকদার

নাসিম সিকদার

ব্যাপক দূষণ ও পরিবেশ অবক্ষয়ের কারণে বর্তমান বিশ্ব আজ এক গভীর বিপর্যয়ের মুখোমুখি। এর ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে আমাদের জীববৈচিত্র্য, প্রাণিজগৎ ও সামগ্রিক মানবজীবন। এই সঙ্কটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে প্রথম আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের জুনে, সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের প্রথম মানব পরিবেশ সম্মেলনে। সেই সম্মেলনের আলোকেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ২৭তম অধিবেশনে প্রতি বছরের ৫ জুন তারিখটিকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে পালন করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মূলত এই বিশেষ অনুভূতি ও তাগিদ থেকেই পরবর্তীতে জন্ম নেয় জাতিসঙ্ঘ পরিবেশ কর্মসূচি। বর্তমানে একই বৈশ্বিক চেতনাকে ধারণ করে সারা পৃথিবীর সর্বত্র এই দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পর ইতোমধ্যে এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে; অথচ এই দীর্ঘ সময়েও আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণ ও গণসচেতনতা বৃদ্ধির গতি এখনো বেশ ধীর রয়ে গেছে।

বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মতো বাংলাদেশেও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নানাবিধ চলমান কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ধরিত্রী সম্মেলনে অনুমোদিত ‘এজেন্ডা ২১’ বাস্তবায়নের ধারাবাহিক অংশ হিসেবে দেশে জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম (নেমাপ) বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। পাশাপাশি, দেশের পানি, মাটি ও বায়ুদূষণ নিয়মিতভাবে মনিটরিং করার জন্য পরিবেশ অধিদফতর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭-এর আইনি ক্ষমতার আওতায় তাদের কার্যক্রম সুচারুভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। এ দেশে প্রথম পরিবেশ নীতি প্রণয়ন করা হয় ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে এবং এর তিন বছর পর, অর্থাৎ ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে কার্যকর করা হয় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে যে বিধিমালা জারি করা হয়, তার অধীনে দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিতকরণ, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং যেকোনো নতুন শিল্প কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ‘ছাড়পত্র’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা পরিবেশ রক্ষায় একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। শুধু কলকারখানার ক্ষেত্রেই নয়, বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি যেকোনো ধরনের উন্নয়নমূলক প্রকল্প চালুর ক্ষেত্রেও এই ‘ছাড়পত্র’ গ্রহণ করার আইনি পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে। এর বাইরেও পরিবেশ অধিদফতর বিশেষ চারটি শিল্প সেক্টরের সুরক্ষার্থে নির্দিষ্ট পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে।

অত্যধিক জনসংখ্যার চাপ, প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার অভাব, নদ-নদীর পানি দূষণ এবং উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষা করা এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। এই সঙ্কট মোকাবেলায় দেশের সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা এখন একান্ত প্রয়োজন। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে যদি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই রূপ দিতে হয়, তবে সবার আগে পরিবেশকে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত রাখা বাঞ্ছনীয়। আর এই গভীর সত্যটিকে মনে করিয়ে দিতেই প্রতি বছর একেকটি সময়োপযোগী প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোকে সর্বসাধারণকে সচেতন হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস।