ডা: মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
নারী উত্ত্যক্তকরণ একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। রাস্তাঘাট, কর্মস্থল, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আজ নারীরা নানা রকম উত্ত্যক্ততা, হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এ অবস্থা শুধু নারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং একটি সভ্য সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কেও সামনে আনে। অথচ ইসলাম নারীকে দিয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী উত্ত্যক্তকরণ একটি গুরুতর অপরাধ এবং এর প্রতিরোধে রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও কঠোর শাস্তির বিধান।
নারীর মর্যাদা ও সম্মান : ইসলাম নারীর প্রতি যে সম্মান দেখিয়েছে, তা ১৪০০ বছর আগেই পৃথিবীতে উদাহরণ স্থাপন করেছে। নারীকে কেবল ভোগ্যবস্তু হিসেবে না দেখে, একজন পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত মানুষ হিসেবে ইসলামে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘নিশ্চয়ই আমি মানবজাতিকে পুরুষ ও নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছি... ।’ (সূরা হুজুরাত-১৩)
এ আয়াতটি মানবজাতির মৌলিক সমতা এবং মর্যাদার কথা ঘোষণা করে, যা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। ইসলামে নারীর প্রতি সহানুভূতি, সম্মান এবং দয়া প্রদর্শনের বার্তা নবী করিম সা: তাঁর জীবন ও বাণীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ করে।’ (তিরমিজি-৩৮৯৫)
উত্ত্যক্তকরণ ও হয়রানির বিরুদ্ধে ইসলাম : নারী উত্ত্যক্তকরণ একটি জঘন্য অপরাধ। এর মধ্যে রয়েছে কটূক্তি, বাজে ইঙ্গিত, শরীরের দিকে কুদৃষ্টি, অনুসরণ করা, অশ্লীল বার্তা পাঠানো কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা। ইসলাম এসব আচরণকে যিনা বা পাপের প্রথম ধাপ বলে চিহ্নিত করেছে। রাসূল সা: বলেন, ‘চোখের যিনা হলো কুদৃষ্টি, জিহ্বার জিনা হলো অশ্লীল বাক্য, মন চায় ও কামনা করে, আর যৌনাঙ্গ তা বাস্তবায়ন করে বা না-ও করে।’ (মুসলিম-২৬৫৭)
এই হাদিসে চোখের দৃষ্টিকেও অপরাধের সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ইসলামে যেকোনো ধরনের হয়রানি, চাওয়া-পাওয়ার বাইরে অন্যকে উত্ত্যক্ত করা, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
পর্দা ও সংযম প্রতিরোধব্যবস্থা : ইসলাম উত্ত্যক্তকরণ প্রতিরোধে দু’টি মূল নির্দেশনা দেয়- ১. পর্দার বিধান এবং ২. নৈতিক সংযম। কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘(হে নবী,) মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে। এতে তাদের জন্য রয়েছে পরিশুদ্ধি।’ (সূরা নূর-৩০) পরবর্তী আয়াতে নারীদেরও অনুরূপ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে- ‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে...।’ (সূরা নূর-৩১)
এখানে দেখা যায়, ইসলাম উভয় লিঙ্গের জন্যই দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ এবং লজ্জাস্থান রক্ষার কথা বলেছে, যা সামাজিক ব্যভিচার, কুদৃষ্টি ও উত্ত্যক্ততা বন্ধ করতে সহায়তা করে।
আইনি দিক ও শাস্তির বিধান : ইসলামে নারী উত্ত্যক্তকরণ শুধু নৈতিক অপরাধ নয়, এটি সামাজিক অপরাধ এবং ইসলামী আইনে এর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। যদি কেউ কোনো নারীর প্রতি কুদৃষ্টি, কটুবাক্য বা দৈহিক হয়রানিতে লিপ্ত হয়, তা প্রমাণিত হলে শাস্তি হিসেবে জরিমানা, কারাদণ্ড বা বেত্রাঘাত প্রযোজ্য হতে পারে। হজরত ওমর রা:-এর শাসনামলে এক ব্যক্তি এক নারীর দিকে কুদৃষ্টিতে তাকানোয় তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলামী শাসনব্যবস্থায় এমন অপরাধ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে।
নারীর নিরাপত্তায় পুরুষদের দায়িত্ব : ইসলামে পুরুষদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে নারীকে সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেয়ার জন্য। রাসূল সা: বলেন, ‘তোমরা নারীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো, কারণ তারা তোমাদের জীবনের অংশীদার।’ (বুখারি)
এ কথায় বোঝা যায়, নারীদের শুধু সহানুভূতির নয়, প্রতিরক্ষার দায়িত্বও সমাজের পুরুষদের ওপর বর্তায়। ইসলাম চায় এমন এক সমাজ, যেখানে নারী নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, কাজ করতে পারে এবং নিজস্ব মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে।
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক সচেতনতা : ইসলামী সমাজব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো পরস্পরের অধিকার রক্ষা। নারীকে উত্ত্যক্ত করা, তার পথরোধ করা, অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করা এগুলো শুধু ইসলাম বিরোধী নয়, এগুলো মানবতারও বিরুদ্ধাচরণ। কাজেই মুসলিম সমাজে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ইসলামী শিক্ষার প্রয়োগ : বর্তমান সময়ে নারী হয়রানির বিরুদ্ধে আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। সেখানে ইসলামী নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষার চর্চা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারে সন্তানদের ইসলামী মূল্যবোধ শেখানো, স্কুল-কলেজে নৈতিক শিক্ষা প্রচলন এবং মসজিদ-মাদরাসা থেকে সচেতনতামূলক বার্তা প্রদান- এসবই একটি সুস্থ সমাজ গঠনের উপায়।
ইসলাম এমন একটি সমাজ গঠনের নির্দেশ দেয় যেখানে নারী পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে জীবনযাপন করতে পারে। আজকের মুসলিম সমাজে ইসলামী মূল্যবোধের যথাযথ চর্চা ও প্রয়োগই পারে নারী উত্ত্যক্তকরণ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে।
লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক



