সিলেট ব্যুরো
- কোম্পানীগঞ্জের হাইটেক পার্ক এলাকা বিবেচনায়
- থাকছে এআই-চালিত রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা ও রোবোটিক সার্জারি প্রযুক্তি
সিলেটে চীনা বিনিয়োগ ও কারিগরি সহায়তায় এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের স্থান নির্বাচন ও প্রাথমিক জরিপের অংশ হিসেবে বুধবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী চীনা বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিদলকে নিয়ে সিলেট-৪ আসনের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানীগঞ্জের হাইটেক পার্ক এলাকা বা এর আশপাশে এই মেগা হাসপাতালের স্থান নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে চূড়ান্ত জায়গা নির্বাচনে আরো কিছু সময় লাগবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
সিলেট-৪ আসনটি সিলেট মহানগরের কাছাকাছি কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। খনিজসম্পদ, পাথরসহ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও এ অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নত চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। সিলেট বিভাগের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে এই প্রকল্প নেয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বিশেষ আমন্ত্রণে চীনের উচ্চপর্যায়ের বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিদল বর্তমানে সিলেটে অবস্থান করছে। বুধবার তারা মন্ত্রীর সাথে গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থান ঘুরে দেখেন।
প্রস্তাবিত এক হাজার শয্যার মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতালটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে সিলেট বিভাগের চার জেলার মানুষই এর সুফল পায়। সিলেট জেলা বিভাগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় উন্নত সড়ক, বিমানবন্দর ও রেল যোগাযোগের সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের যাতায়াত সহজ হবে। একইসাথে আন্তর্জাতিক মানের এ অবকাঠামো সিলেটের চিকিৎসা-পর্যটন খাতকেও এগিয়ে নিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের হাওর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। প্রস্তাবিত হাসপাতালটি সিলেট-৪ আসনে নির্মিত হলে ছাতক, দোয়ারাবাজারসহ সুনামগঞ্জের বড় একটি অংশের মানুষ কাছাকাছি আন্তর্জাতিক মানের আইসিইউ, সিসিইউ ও ট্রমা সেন্টারের সেবা পাবে। প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলার রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও স্থানীয় চা-শ্রমিকদের জন্যও এই হাসপাতালটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীনের উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থার মডেল চালু হলে প্রবাসীরা দেশে থাকা পরিবারের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারবেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অন্যদিকে, হবিগঞ্জ দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠায় সেখানকার শিল্পকারখানার হাজারো শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জরুরি ও বিশেষায়িত চিকিৎসার ক্ষেত্রেও হাসপাতালটি বড় ভরসাস্থল হয়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, চীনা বিনিয়োগের বড় অংশ আসতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা এবং আধুনিক রোবোটিক সার্জারি প্রযুক্তিতে। এসব প্রযুক্তি বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
হাসপাতালটি নির্মাণ ও পরিচালনার মাধ্যমে সিলেট বিভাগের চার জেলার হাজারো তরুণ-তরুণী, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ও চিকিৎসকের আন্তর্জাতিক মানের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সাথে গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জের মতো ভারত সীমান্তসংলগ্ন এলাকার মানুষ ঘরের কাছেই উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে।
এত বড় একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, ওষুধ শিল্প, আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতেও নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। চিকিৎসার জন্য ঢাকা কিংবা ভারতের চেন্নাই-কলকাতায় যাওয়ার প্রবণতা ও খরচ কমে আসবে বলেও আশা করছেন স্থানীয়রা।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সিলেটের মানুষের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান অঙ্গীকার। চীনা বিনিয়োগকারীদের এই পরিদর্শন এবং হাসপাতাল নির্মাণের প্রাথমিক প্রক্রিয়া গোটা সিলেট বিভাগের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করবে। চিকিৎসার জন্য কাউকে আর ঢাকামুখী হতে হবে না।’ তিনি আরো জানান, সিলেট সার্কিট হাউজে প্রাথমিক বৈঠক এবং মাঠপর্যায়ের জরিপ শেষে চূড়ান্ত ভূমি অধিগ্রহণ ও আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে চলছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুতই সিলেটের এই মেগা হাসপাতাল দৃশ্যমান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম বুধবার বিকেলে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনা বিনিয়োগকারীদের নিয়ে আমরা কোম্পানীগঞ্জের হাইটেক পার্ক এলাকা ও পাশের তেলিখাল এলাকা ঘুরে দেখেছি। হাসপাতালের জন্য কোন জায়গা উপযুক্ত, তা নির্বাচন করতে আরো কিছু সময় লাগবে। পুরো প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।’



