ভিসা আবেদন যাচাই সহজে ব্যাংক নথিতে কিউআর কোড বাধ্যতামূলক

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বিদেশ ভ্রমণ, উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন দেশের ভিসার জন্য আবেদন করেন। এসব ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট, ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটসহ নানা আর্থিক নথি জমা দিতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে এসব নথির সত্যতা যাচাই নিয়ে দূতাবাস ও ভিসা সেন্টারগুলোকে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। জাল কাগজপত্র জমা দেয়ার অভিযোগ, তথ্য যাচাইয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে ভিসা প্রক্রিয়ায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। এ বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর জন্য এ বিষয়ে এক সার্কুলার জারি করা হয়েছে।

নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এখন থেকে ভিসা আবেদনের জন্য ইস্যুকৃত ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটে বাধ্যতামূলকভাবে অনলাইন যাচাইযোগ্য কিউআর কোড সংযুক্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে দূতাবাস বা ভিসা সেন্টার তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা যাচাই করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বর্তমানে বিদেশী দূতাবাস ও ভিসা সেন্টারগুলোতে জমা দেয়া ব্যাংক-সংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের জন্য সরাসরি ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। এতে সময়ক্ষেপণ হয়, অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায় না এবং প্রশাসনিক ব্যয়ও বেড়ে যায়। একই সাথে কিছু ক্ষেত্রে জাল নথি ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। ফলে পুরো ভিসা প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে এমন একটি ব্যবস্থা চালু করতে হবে যাতে কিউআর কোড স্ক্যান করলেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের নির্দিষ্ট কিছু তথ্য যাচাই করা যায়। এর মধ্যে থাকবে হিসাব নম্বর, হিসাবধারীর নাম, রিপোর্টের তারিখ অনুযায়ী উদ্বৃত্তের পরিমাণ, সমাপনী স্থিতি এবং স্টেটমেন্ট তৈরির তারিখ। অর্থাৎ কোনো দূতাবাস বা ভিসা সেন্টার কিউআর কোড স্ক্যান করেই বুঝতে পারবে জমা দেয়া নথিটি আসল কিনা এবং তথ্যের সাথে কোনো ধরনের কারসাজি হয়েছে কি না।

বাংলাদেশ ব্যাংক আরো জানিয়েছে, এসব তথ্য কমপক্ষে ছয় মাস সংরক্ষণ করতে হবে এবং তা অনলাইনে যাচাইযোগ্য রাখতে হবে। ফলে পরে প্রয়োজন হলেও সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা পুনরায় যাচাই করা সম্ভব হবে। একই সাথে ব্যাংকগুলোকে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা মেনে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনায় গ্রাহকের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোকে ৯০ দিনের সময় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংককে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার, অনলাইন যাচাই প্ল্যাটফর্ম এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রস্তুত করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় ব্যাংকগুলোর জন্য এ ধরনের প্রযুক্তি চালু করা তুলনামূলক সহজ হলেও ছোট ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু ভিসা প্রক্রিয়াকেই সহজ করবে না বরং দেশের ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের গতি আরো বাড়াবে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আর্থিক নথির ডিজিটাল যাচাই একটি স্বীকৃত পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। অনেক দেশেই ব্যাংকিং ও আর্থিক তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কিউআর কোড ও অনলাইন ভেরিফিকেশন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় জাল ব্যাংক স্টেটমেন্ট ব্যবহার একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় ভুয়া স্টেটমেন্ট তৈরি করে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করে। নতুন কিউআরভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালু হলে এ ধরনের প্রতারণা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সাতে দূতাবাসগুলোর আস্থাও বাড়বে, কারণ তারা সরাসরি অনলাইনে তথ্য যাচাই করতে পারবে।

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষ করে গ্রাহকের তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সার্ভারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। যদি কোনো ব্যাংকের অনলাইন যাচাই ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে বা সাইবার হামলার শিকার হয়, তাহলে তা ভিসা আবেদনকারীদের জন্য নতুন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রযুক্তিগত অবকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং ও নিরাপত্তা নিরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সব মিলিয়ে, ভিসা আবেদন সংক্রান্ত ব্যাংক নথিতে কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তকে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও ডিজিটালাইজেশনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এক দিকে যেমন জালিয়াতি কমবে, অন্য দিকে বিদেশগামী মানুষের ভিসা প্রক্রিয়াও হবে আরো দ্রুত, সহজ ও নির্ভরযোগ্য।