জীবনের অনুষঙ্গ হোক বইপাঠ : সালেহ আব্দুর রাজ্জাক

Printed Edition
জীবনের অনুষঙ্গ  হোক বইপাঠ :  সালেহ আব্দুর রাজ্জাক
জীবনের অনুষঙ্গ হোক বইপাঠ : সালেহ আব্দুর রাজ্জাক

আল্লাহর সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত কেন হয়েছে জানেন তো? জ্ঞানের কারণে। জ্ঞানই তাকে পরিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। আর বই হলো সেই জ্ঞানের আকর, যার শব্দের ভাজে ভাজে মিশে আছে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ জ্ঞানের বীজ, জ্ঞানী-গুণীজনদের জীবন নিংড়ানো অভিজ্ঞতা। তাই বই পড়ুন । ছড়িয়ে দিন, জীবন থেকে জীবনের তরে।

আচ্ছা!

আমরা সবাই তো মানুষ। তবুও ছোটবেলায় কেন এই কথাটি বারবার শুনতে হয়েছে- ‘মানুষের মতো মানুষ হও’ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ‘মানুষ’ হওয়ার এই তাগিদ কেন? উত্তরটি কিন্তু খুবই তরল, সবাই জানি- ভালো মানুষ হতে। ভালো মানুষ হওয়ার সুপ্ত বাসনা তো আমরা সবাই লালন করি, করি না? অবশ্যই। কিন্তু সেই বাসনা বিকশিত করতে যে প্রয়োজন স্বচ্ছ মন ও সুচিন্তার করোটি। সেটি অর্জন হবে সৎ সংস্রবে।

আর বইয়ের মতো সৎসঙ্গী, পরোপকারী, হিতৈষীর সংস্রবের চেয়ে উত্তম কোনো সংস্রব নেই। কেননা, দু’টি অক্ষরে গড়া এই ‘বই’ শব্দটির সত্তাই যে এ কথা বলে- ‘ব’ মানে বক্ষ, বক্ষ মানে হৃদয়। হ্রস্ব-ই মানে ইন্দু বা শ্রেষ্ঠ। সুতরাং গুণবতী-রূপবতী এই বইয়ের অর্থ হলো- শ্রেষ্ঠ হৃদয় গড়ার কারখানা। সেই সাথে মেধাকে তীক্ষè, অনুভূতিকে শাণিত এবং দৃষ্টিকে পরিশীলিত করে এই বই।

যেমন- ঘড়ির টিকটিক শব্দে যখন আমাদের জীবন সঞ্চিত সময়গুলো খসে পড়ে নিঃশব্দে, অতি সন্তর্পণে। তখন আমরা অনেকে মোবাইলে ফেসবুক, ভিডিও গেমস, কিংবা মুভি দেখা- এই সমস্ত কাজে মগ্ন থাকি।

কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো- এগুলো হচ্ছে তৈরিকৃত বিষয়, যা আমাদের সম্মুখে ঝরঝরে পরিবেশিত হয়। তবে এসব বুঝতে কিন্তু চিন্তার কোনো প্রয়োজন পড়ে না; মেধা-মস্তিষ্কের তেমন কাজ থাকে না সেখানে; অচল পড়ে থাকে। জং ধরে। ভোঁতা হয়ে যায় এক সময়। সময়টাও নষ্ট হয় অযথাই।

পক্ষান্তরে যখন আমরা বই পড়ি- গল্প, উপন্যাস কিংবা বিবিধ কোনো বিষয়ে, খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, তখন আমাদের স্মৃতিপটে পাঠানুযায়ী নির্মিত হয় এক কাল্পনিক চিত্র। যেটি নির্মাণে মস্তিষ্কের করতে হয় কঠোর পরিশ্রম, করতে হয় নানাবিধ ব্যায়াম। ফলে ধীরে ধীরে মেধা হয়ে ওঠে আরো ধারালো, সুতীক্ষè।

সে তখন অর্জন করে অতীতের জ্ঞান। জানতে পারে যুগের ভাষা। বুঝতে পারে বর্তমানের চাহিদা। তাই ভবিষ্যৎকে সাজাতে পারে মনের মতো।

‘তাই স্বচ্ছ ও সুন্দর জীবন প্রত্যাশী ব্যক্তির জন্য বই পাঠের বিকল্প শুধুই বইপাঠ।’

বই পাঠের এমন রগরগে বয়ান শুনে বই বিরাগী মানুষটিও বই হাতে পড়তে বসে কখনো-সখনো। ঝোঁকের ঘোরে তরতর করে পড়েও ফেলে কয়েক পৃষ্ঠা। কিন্তু বিপত্তি বাজে দিন কয়েক পর; যখন তার পঠিত গল্প-ইতিহাসের জায়গা বা ব্যক্তির নাম ভুলে যায়, ভুলে যায় তার পঠিত উপন্যাসের চরিত্র। তখন রাগত স্বরে তার অভিযোগ- ‘এত কষ্ট করে বইখানা পড়লাম, অথচ নাম ধাম কিছুই মনে নেই, তাহলে বই পড়ে লাভটা কী শুনি।’

তাদের এই রূঢ় অভিযোগের খুব মধুর জবাব দিয়ে শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ মুফতি আল-আমিন সাহেব বলতেন-

-শোনো! খেজুর যে একটি উপকারী ফল, এটি কি জানো? জি।

আচ্ছা মনে করো তুমি একটি খেজুর খেয়েছ, উপকার হয়েছে নিশ্চয়ই? জি শতভাগ।

আচ্ছা এখন যদি জিজ্ঞাসা করি- উপকারটা কোথায় হয়েছে বাবা বলো তো! হাতে নাকি পায়ে? আমি মাথা চুলকিয়ে- জি, না, মানে!

জানি উত্তরটি নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে উপকার হয়েছে নিশ্চিত। ঠিক তেমনি বই পড়লেই উপকার হবে- এটি সত্য; এমনকি ভুলে গেলেও! কিন্তু কীভাবে? সেটি সর্বদা নির্দিষ্ট করে বলাটা মুশকিল। তবে সেটি বুঝতে পারবে নিশ্চয়ই- কখনো প্রত্যক্ষভাবে কখনো পরোক্ষভাবে, কখনোবা হৃদয়ের বন্ধ প্রকোষ্ঠে অজান্তেই জ্বেলে উঠবে জ্ঞানের পিদিম। যা নীরবে-নিভৃতে জীবনকে করবে আলোকিত। তাই বই পড়ুন। ভবিষ্যতকে দীপান্বিত করুন। কথায় বলে- আজকের পাঠকই কালকের নেতা। Today a reader, tomorrow a leader.