নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দেশের আইনশৃঙ্খলার চিত্র যেন প্রতিদিনই আরো উদ্বেগজনক হয়ে পড়ছে। ঘরের ভেতর নিরাপদ নয় গৃহবধূ, খেলার মাঠে নিরাপদ নয় শিশু, নদীর তীরে নিরাপদ নয় কিশোরী- সহিংসতা যেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। পাওনা টাকার বিরোধ থেকে রাজনৈতিক আক্রোশ, বাঁশঝাড়ের চারা ভাঙার জেরে পরিকল্পিতভাবে হত্যা- যেকোনো তুচ্ছ কারণেই প্রাণ যাচ্ছে মানুষের। যা বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একাধিক হত্যা, ধর্ষণ ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে, কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ঘটনায় মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিস্তারিত জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিনিধিরা।
বরগুনা ডাকবাংলোয় মা ও দুই মেয়ের লাশ : বরগুনা প্রতিনিধি জানান, বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলো থেকে এক নারী ও তার দুই কন্যার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার বিকেলে ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি পৃথক কক্ষ থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন- বরগুনা পৌর শহরের কালিবাড়ী এলাকার দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী ইতি রানী (৩৪) এবং তার দুই মেয়ে আরাধা বিশ্বাস (১২) ও অনুরাধা বিশ্বাস (৩)। ইতি রানী জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে কর্মস্থলে এলেও বুধবার তিনি বেলা ১১টার দিকে দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে ডাকবাংলোয় আসেন। পরে তৃতীয় তলার একটি কক্ষ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় সহকর্মীদের সন্দেহ হলে পুলিশকে খবর দেয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি কক্ষ থেকে বড় মেয়ে আরাধার লাশ এবং ভেতর থেকে বন্ধ থাকা অপর কক্ষ থেকে ইতি রানী ও ছোট মেয়ে অনুরাধার লাশ উদ্ধার করে।
বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো: নুজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ডাকবাংলোতে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দুই শিশুকে হত্যার পর মা আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বরগুনার পুলিশ সুপার মো: কুদরত-ই-খুদা জানান, বড় মেয়ের লাশ পাওয়া কক্ষে ঘুমের ওষুধের কয়েকটি খালি পাতা ও পানির বোতল পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পাবনায় বস্তাবন্দী কিশোরীর লাশ : পাবনা প্রতিনিধি জানান, সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নের বলরামপুর-পীরপুরসংলগ্ন পদ্মা নদীর তীর থেকে হাত বাঁধা ও বস্তাবন্দী অবস্থায় এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার সকালে লাশটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের ধারণা, নিহতের বয়স ১৪ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। তার গলায় একটি রূপার চেইন ছিল এবং গলায় বাজারের ব্যাগ প্যাঁচানো অবস্থায় লাশটি একটি বস্তার মধ্যে পাওয়া যায়। স্থানীয়দের দাবি, মঙ্গলবার রাতে এলাকায় একটি সন্দেহজনক প্রাইভেটকার দেখা গিয়েছিল। ঘটনার সাথে ওই গাড়ির কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাবনা সদর থানার ওসি তরিকুল ইসলাম জানান, পরিচয় শনাক্ত ও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
ময়মনসিংহে ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত : ময়মনসিংহ অফিস জানায়, নগরীর চর ঈশ্বরদিয়া মধ্যাপাড়া এলাকায় পূর্ব বিরোধের জেরে সংঘর্ষে রানা মিয়া (২৮) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার বিকেলে সংঘটিত এ ঘটনায় আরো পাঁচজন আহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় রানাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের স্বজনদের দাবি, প্রতিপক্ষের হামলায় তিনি ছুরিকাঘাতের শিকার হন। তবে ঘটনাটি রাজনৈতিক নাকি গোষ্ঠীগত বিরোধের জেরে ঘটেছে, তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে।
শেরপুরে ভাইয়ের হামলায় কৃষকের মৃত্যু : বগুড়ার শেরপুর প্রতিনিধি জানান, বাঁশঝাড়ের কোরল (নতুন বাঁশের চারা) ভাঙাকে কেন্দ্র করে হজরত আলী (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মঙ্গলবার উপজেলার বেলঘড়িয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাচাতো ভাই আব্দুর রহিম ও তার ছেলে নাইম লোহার পেরেকযুক্ত বাঁশ দিয়ে হজরত আলীকে মারধর করেন। পরে হাসপাতালে নেয়া হলে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে এবং আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
কেন্দুয়ায় টাকার বিরোধে যুবক খুন : নেত্রকোনার কেন্দুয়া প্রতিনিধি জানান, মাত্র দুই হাজার টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে মিলন মিয়া (৩৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। বুধবার উপজেলার কান্দাপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে ইমন মিয়া ধারালো অস্ত্র দিয়ে মিলনকে আঘাত করেন। হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ ইমন ও তার মা হাবিয়া বেগমকে আটক করেছে।
ফরিদপুরে দুই লাশ উদ্ধার : ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার বোয়ালমারী ও নগরকান্দা উপজেলায় পৃথক ঘটনায় দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। বোয়ালমারীতে দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর দক্ষিণ ভাটপাড়া এলাকার একটি পাটক্ষেত থেকে তৌহিদ মিয়া (২৬) নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে। মৃত্যুর কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
অন্যদিকে নগরকান্দার কৃষ্ণপুর গ্রামে চালতা গাছ কাটার সময় গাছ থেকে পড়ে সেখ আকু (৬৫) নামে এক করাতি নিহত হন। নিচে থাকা বাঁশের খুঁটির ওপর পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
টঙ্গীবাড়ীতে গাছে ঝুলন্ত যুবকের লাশ : মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, টঙ্গীবাড়ী উপজেলার রাউৎভোগ গ্রামে মানিক খাঁন (২৪) নামে এক যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরিবারের দাবি, এক বছর আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পাওয়ার পর তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। বুধবার ভোরে বাড়ির পাশে একটি কাঁঠাল গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ পাঠানো হয়েছে।
শিবপুরে নবজাতকের লাশ উদ্ধার : নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, শিবপুর-পচারবাড়ি সড়কের পাশে একটি ধানক্ষেত থেকে নবজাতক এক ছেলে শিশুর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার সকালে স্থানীয়রা একটি কার্টনের মধ্যে লাশটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। ঘটনাস্থল থেকে কিছু কাপড়ও উদ্ধার করা হয়েছে। নবজাতকের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ।
সাভারে গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ : সাভার প্রতিনিধি জানান, কাউন্দিয়া ইউনিয়নের আলীনগর এলাকায় দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক গৃহবধূকে সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও আরো দুই অভিযুক্ত পলাতক রয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২২ মে গভীর রাতে স্বামীর অনুপস্থিতিতে কয়েকজন ব্যক্তি বাসায় ঢুকে গৃহবধূকে ধর্ষণ করে এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। পরে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়। ভুক্তভোগী পরিবার বাকি আসামিদের গ্রেফতার ও ভিডিও উদ্ধার করার দাবি জানিয়েছে।
উলিপুরে শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ : কুড়িগ্রামের উলিপুর প্রতিনিধি জানান, পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার পৌর এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনে ঘটনাটি ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। শিশুটি বর্তমানে চিকিৎসাধীন। বুধবার আটক কিশোরকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
দর্শনায় বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ : চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা প্রতিনিধি জানান, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে এক নারীকে দীর্ঘদিন ধর্ষণ, অর্থ আত্মসাৎ এবং পরে হুমকি দেয়ার অভিযোগে দর্শনা থানা ছাত্রদলের এক নেতার বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং অর্থও নেন। বর্তমানে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তবে অভিযুক্ত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।



