দেশে ফিরে বিরোধীদলীয় নেতা

বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার বিবেচনা করে জাপান

Printed Edition
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান জাপান সফর শেষে দেশে ফিরে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন  : নয়া দিগন্ত
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান জাপান সফর শেষে দেশে ফিরে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাপান আমাদের দেশকে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান।

এক সপ্তাহের জাপান সফর শেষে গতকাল দুপুরে দেশে ফিরে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান। গত ২ মে রাত ৩টায় ডা: শফিকুর রহমান জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন। তার সফর সঙ্গী ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি এবং আমিরের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান এমপি।

জামায়াত আমিরকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, উত্তরের আমির মো: সেলিম উদ্দিন, দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ।

বিমানবন্দরে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে জামায়াত আমির বলেন, জাপান সফরে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাইকা এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ, শিক্ষা বিনিময়, দক্ষতা উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এ সময় বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া সফরে ক্যান্সার চিকিৎসা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।

ডা: শফিকুর রহমান জানান, ফেরার পথে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন জুলাই আন্দোলনের আহতদের খোঁজখবর নেয়া হয়েছে। তাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে সরকারকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) দুই বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ এবং তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, গত ৮ মে রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের ধজনগরের বাতেনবাড়ি গ্রামের এইচ এস সি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো: মুরসালিন এবং একই ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের নবীর হোসেনকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করেছে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ এবং তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা, শোকসন্তপ্ত পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। দোয়া করছি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের এই কঠিন শোকে ধৈর্যধারণ করার তাওফিক দান করুন।

তিনি আরো বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্তে প্রায়ই বিনা কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটায়। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার জন্য ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও হত্যাকাণ্ড ক্রমাগতভাবেই বাড়ছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বাংলাদেশীদের অন্যায় হত্যার বিচার না হওয়া খুবই উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ সরকারের দুর্বল পররাষ্ট্র নীতির কারণেই ভারত বারবার সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণ সব সময়ই প্রতিবেশীদের কাছে বন্ধুসুলভ আচরণ কামনা করে। আশা করি, ভারত সরকার সীমান্তে অনাকাক্ষিত হত্যা বন্ধ করবে। মো: মুরসালিন ও নবী হোসেনসহ এ পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সংঘটিত সব হত্যার সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। একই সাথে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভাগে ‘শিক্ষা খাতকে জামায়াতমুক্ত করতে হবে’ শিরোনামে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর ছাপানো হয়েছে অভিযোগ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, দেশের গণমাধ্যমগুলো নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার অক্ষুণœ রেখে নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতি অবলম্বন করে সত্য তথ্য জনগণের কাছে তুলে ধরার কাজ করবে এমনটাই প্রত্যাশা। কিন্তু কোনো পত্রিকা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য সাধন কিংবা কোনো দলের ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করবে, অন্য দল নিয়ে ভ্রান্ত সংবাদ প্রকাশ করবে- তা অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য। দৈনিক ইনকিলাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ‘শিক্ষা খাতকে জামায়াতমুক্ত করতে হবে’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। একই সাথে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি জাতির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ও ন্যক্কারজনক হিসেবে উন্মোচিত হয়েছে।

অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, জামায়াত সবসময় দেশের ও জাতির কল্যাণের শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাসী। শিক্ষা খাতকে কল্যাণমুখী করতে সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শ দিতে জামায়াত সবসময় কাজ করে আসছে। সম্প্রতি বিরোধী দলের কয়েকজন এমপি জামায়াতের শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস ও পরামর্শ দিয়েছেন। শিক্ষা খাতে বিশৃঙ্খলা, দখলবাজিসহ কোনো প্রকার বিশেষ মত প্রতিষ্ঠার সুযোগে বিশ্বাস করে না জামায়াত। এমনকি শিক্ষাঙ্গনগুলো নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বোর্ডের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। সেখানে বিশেষ মত প্রতিষ্ঠার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু প্রকাশিত ‘সম্পাদকীয়তে’ ‘মওদূদীবাদ’ নামে মিথ্যা মতাদর্শ টেনে সংবাদ সাজানো হয়েছে। দেশবাসীর উদ্দেশে আমরা স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, দুনিয়াতে ‘মওদূদীবাদ’ বলে কোনো মতবাদ নেই। এটা একটি বিশেষ মহলের জামায়াত বিরোধিতার জন্য তৈরি ন্যারেটিভ ছাড়া আর কিছু নয়। বরং বাস্তবতা হলো জামায়াতে ইসলামী, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা, নীতি ও স্পিরিটকে ধারণ করে। জামায়াতে ইসলামী সবসময় সলফে-সালেহীনদের পথ অনুসরণ করে এবং একইভাবে তার নেতাকর্মীদেরও ইসলামের বিধিবিধান অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করে থাকে।

তিনি আরো বলেন, প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে বিভিন্ন মাজহাবের অনুসারীদের মধ্যে অত্যন্ত সুকৌশলে বিভেদ, বিদ্বেষ ও বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। সত্যি ব্যাপার হলো জামায়াত সকল মাজহাবের অনুসারীদের প্রতি সম্মান দেখায়, কাউকে খাটো করে না- যা নেতাকর্মীদের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়। জামায়াত মনে করে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হবে- যাতে সকল মানুষ তার বোধ-বিশ্বাস লালন করার পাশাপাশি দক্ষ ও যোগ্য হয়ে নিজেকে গড়ে তুলবে এবং জাতির কল্যাণে নিজেকে আত্মনিয়োগ করার সুযোগ পাবে। লেখাপড়া শেষে কেউ বেকার থাকবেন না, কর্মমুখী হবেন।

তিনি বলেন, দেশের নাগরিকরা যেকোনো দলের মতাদর্শের রাজনীতি করতে পারেন- যা তার মৌলিক অধিকার। এ থেকে শিক্ষকসমাজ ব্যতিক্রম নয়, কারণ তারাও নাগরিক অধিকার ভোগ করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখজনক হলো- প্রকাশিত সংবাদে দেশের শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশকে বিশৃঙ্খল ও অস্থিতিশীল করতে উসকানিমূলকভাবে জামায়াতের সমর্থকদের অপসারণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে- যা জাতীয় দৈনিক হিসেবে গর্হিত সম্পাদকীয় নীতি। আমি তাদের নীতি পরিবর্তন করে জনগণের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সারা দেশে নিয়মিত গঠনমূলক কাজ করে আসছে। এর ফলে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসেছে। দেশ পুনর্গঠন করে ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানকে রুখে দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেটি সম্ভব বলে মনে করে জামায়াত। কোনো প্রকার আধিপত্যবাদকে জামায়াত প্রশ্রয় দেয় না, বিশ্বাস করে না এবং নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় রাজনীতি চলমান রেখেছে। একই সাথে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবি জানিয়ে আসছে জামায়াতে ইসলামী।