পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ঘাটতি

উত্তরাঞ্চলের পর্যটন খাতে বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাবনা

Printed Edition

মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল কৃষি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অঞ্চল হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন, নদীভিত্তিক জীবনধারা, চা-বাগান ও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ঘিরে রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন জেলা এখন দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও আধুনিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এ অঞ্চলের পর্যটন খাতে বছরে আট থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরাঞ্চলে পর্যটনের বৈচিত্র্য অসাধারণ। নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। বগুড়ার মহাস্থানগড় দেশের অন্যতম প্রাচীন প্রতœস্থল। দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির ও রামসাগর, রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, বাঘা মসজিদ ও পুঠিয়া রাজবাড়ি পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণ। পঞ্চগড়ের চা-বাগান ও তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য দেশের একমাত্র হিমালয়দর্শনের সুযোগ তৈরি করেছে। রাজশাহীর পদ্মাপাড়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে এবং আম মৌসুমে এ অঞ্চলে পর্যটকের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থান

আম বিশেষজ্ঞ, নদী ও পরিবেশ গবেষক এবং হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলে পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে পারলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। শতভাগ আধুনিকায়ন করা হলে আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং বছরে আট থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।’

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘রাজশাহী অঞ্চলে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এ সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।’ তিনি বিশেষভাবে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সুলতানগঞ্জ করিডোর চালু এবং পদ্মা নদী ড্রেজিংয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, যোগাযোগ ও নৌপথ উন্নয়ন ছাড়া এ অঞ্চলের পর্যটনের বিকাশ সম্ভব নয়।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও গবেষকদের মতে, হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় হস্তশিল্প, গাইড সেবা, নৌভ্রমণ, কৃষিভিত্তিক পর্যটন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ঘিরে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণীর নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, এ অঞ্চলের পর্যটনের প্রধান বাধা হচ্ছে অপ্রতুল যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসনের অভাব ও পর্যাপ্ত বিনোদন সুবিধার ঘাটতি। অনেক দর্শনীয় স্থানে রাস্তা ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত, কোথাও কোথাও গণপরিবহনই নেই। পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট, বিশ্রামাগার, পার্কিং ও নিরাপত্তার অভাবে পর্যটকরা নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখে পড়ছেন।

রাজশাহীর এক পর্যটন উদ্যোক্তা বলেন, ‘ঢাকা বা কক্সবাজারের মতো উত্তরাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রগুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে তেমন প্রচারণা নেই। ফলে অনেকেই জানেন না যে এখানে অসাধারণ সব পর্যটন স্পট রয়েছে।’

মৌসুমনির্ভরতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শীতে পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে পর্যটকের ভিড় বাড়লেও বছরের বাকি সময় সেই প্রবাহ কমে যায়। আম মৌসুমে রাজশাহীতে পর্যটক বাড়লেও তা স্থায়ী রূপ পায় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই পর্যটন গড়তে অঞ্চলভিত্তিক বিশেষায়িত প্যাকেজ চালু করতে হবে। রাজশাহীতে “ম্যাংগো ট্যুরিজম”, পঞ্চগড়ে “টি ট্যুরিজম”, নওগাঁয় “হেরিটেজ ট্যুরিজম” এবং পদ্মা ও যমুনাকেন্দ্রিক “রিভার ট্যুরিজম” চালু হলে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের নতুন আগ্রহ তৈরি হবে।

পর্যটন গবেষকরা বলছেন, গ্রামবাংলার জীবনধারা, লোকসঙ্গীত, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও কৃষিভিত্তিক অভিজ্ঞতাকে কে›ঙ্গ্র করে “কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম” চালু করা গেলে স্থানীয় জনগণ সরাসরি লাভবান হবেন এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের একটি সূত্র জানায়, উত্তরাঞ্চলে পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার ও নতুন বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পর্যটন কেবল বিনোদনের খাত নয়- একটি পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প ও স্থানীয় কৃষিপণ্যের পুরো একটি অর্থনৈতিক চেইন গড়ে ওঠে। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের প্রচারণা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে উত্তরাঞ্চল ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন অঞ্চল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে- সেই সম্ভাবনার বার্তা এখনই স্পষ্ট।