বিশেষ সংবাদদাতা
জ্বালানি খাতের বিশিষ্ট উদ্যোক্তা জাভেদ হোসেন বলেছেন, সোলারে শুল্ক কমানো হলে জ্বালানি খাতে বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় সম্ভব। বাংলাদেশ বর্তমানে বছরে প্রায় ৭ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় করছে। এই ব্যয় অবকাঠামোগত বিনিয়োগ নয়, বরং চলমান খরচ, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এমন ধারাবাহিক ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন। জাভেদ হোসেন সোলার পাওয়ারে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদে কী সুবিধা পাওয়া যাবে তার বিস্তারিত তুলে ধরেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-
প্রশ্ন : বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি আমদানির কাঠামো কতটা চাপ সৃষ্টি করছে?
জাভেদ হোসেন : বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে আনুমানিক ৭ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় করছে। এর মধ্যে প্রায় ৩.৮ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় এলএনজি আমদানিতে এবং ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় তরল জ্বালানি, যেমন ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলে। এই ব্যয় কোনো অবকাঠামোগত বিনিয়োগ নয়, বরং একটি চলমান খরচ, যা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। যেহেতু বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি, তাই এই ধরনের ধারাবাহিক ব্যয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রশ্ন : এই আমদানিনির্ভর মডেলের ভেতরে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা রয়েছে?
জাভেদ হোসেন : জ্বালানি আমদানির পুরো কাঠামোটি একটি বড় আর্থিক প্রবাহ তৈরি করে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ জড়িত, সরকারি সংস্থা, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং আইপিপি (স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক)। এখানে বড় বড় ক্রয়চুক্তি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মার্জিন রয়েছে। আগে বিদ্যুৎ উৎপাদকরা জ্বালানি আমদানির ওপর ৯ শতাংশ পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ পেত, যা এখন ৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। কিন্তু তবুও এই কাঠামোতে অদক্ষতা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ রয়ে গেছে। এতে কিছু গোষ্ঠী লাভবান হলেও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে।
প্রশ্ন : এলএনজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অর্থনীতি কিভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে?
জাভেদ হোসেন : এলএনজি একটি ব্যয়বহুল জ্বালানি, যা এমন একটি গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় সরবরাহ করা হচ্ছে যেখানে উল্লেখযোগ্য সিস্টেম লস ও দুর্নীতি রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভর্তুকিনির্ভর মূল্যব্যবস্থা। ফলে সরকারকে দ্বৈত চাপ নিতে হচ্ছে, একদিকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি, অন্য দিকে ভর্তুকির মাধ্যমে তা সস্তায় সরবরাহ। এই ব্যবস্থার প্রকৃত খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হয়।
প্রশ্ন : কেন এই আমদানিনির্ভরতা থেকে বের হওয়া কঠিন হচ্ছে?
জাভেদ হোসেন : এর পেছনে বড় কারণ হলো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব। জ্বালানি আমদানির সাথে যুক্ত বড় আর্থিক প্রবাহের কারণে কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থ এতে জড়িয়ে গেছে। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে জটিল হয়ে পড়ে। এতে অস্বচ্ছতা, পুঁজি পাচার এবং অদক্ষতার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রশ্ন : এই প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব কতটা?
জাভেদ হোসেন : সৌরবিদ্যুৎ একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে। যদিও শুরুতে বিনিয়োগ প্রয়োজন, কিন্তু একবার স্থাপনের পর এর উৎপাদন ব্যয় প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। এটি জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। অর্থাৎ এটি শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত লাভজনক।
প্রশ্ন : তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য সোলার গ্রহণে প্রধান বাধা কী?
জাভেদ হোসেন : প্রধান বাধা হলো উচ্চ কর ও শুল্ক। স্থানীয়ভাবে কেনা সোলার প্যানেলের ওপর প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। ইনভার্টার, ব্যাটারি, মাউন্টিং স্ট্রাকচার এবং অর্থায়নসহ পুরো সিস্টেম বিবেচনায় খরচ ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে সাধারণ পরিবার বা ছোট ব্যবসার জন্য এটি আর্থিকভাবে অপ্রতুল হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন : এই নীতিতে কি বৈষম্য তৈরি হচ্ছে?
জাভেদ হোসেন : অবশ্যই। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ইউটিলিটি পর্যায়ের প্রকল্পগুলো অনেক সময় শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়, কিন্তু সাধারণ গ্রাহক তা পায় না। এতে একটি দ্বৈত কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে বড় বিনিয়োগকারীরা সুবিধা পাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ জনগণ পিছিয়ে পড়ছে। এটি সোলারের গণমুখী বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রশ্ন : বৈশ্বিক বাজারে সোলারের বর্তমান অবস্থান কী?
জাভেদ হোসেন : বিশ্বব্যাপী সোলার প্রযুক্তির খরচ দ্রুত কমছে। বিশেষ করে চীনে উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে এটি এখন সবচেয়ে সস্তা জ্বালানি উৎসগুলোর একটি। অনেক দেশে এটি কয়লা ও গ্যাসের চেয়েও কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলে তা কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর হবে।
প্রশ্ন : পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখা যায়?
জাভেদ হোসেন : পাকিস্তানে ছাদভিত্তিক সোলার দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। কিছু অঞ্চলে দিনে মোট বিদ্যুতের ২০-২৫ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে আসে। এটি মূলত ব্যক্তি, কৃষক ও শিল্পখাতের স্বতঃস্ফূর্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে হয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমেছে এবং জ্বালানি আমদানি কমেছে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ একই পথে এগোলে সম্ভাব্য লাভ কতটা?
জাভেদ হোসেন : বাংলাদেশ যদি ২০-২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সৌরশক্তি থেকে উৎপাদন করতে পারে, তাহলে বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করবে এবং অর্থনীতিকে আরো স্থিতিশীল করবে।
প্রশ্ন : নেট মিটারিং নীতি কি যথেষ্ট কার্যকর?
জাভেদ হোসেন : নেট মিটারিং একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এটি যথেষ্ট শক্তিশালী প্রণোদনা নয়। এতে গ্রাহকরা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দিতে পারেন, কিন্তু এর বিনিময়ে যে মূল্য পান তা বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন : তাহলে বিকল্প কী হতে পারে?
জাভেদ হোসেন : ফিড-ইন ট্যারিফ একটি কার্যকর বিকল্প। এতে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য নির্ধারিত ও আকর্ষণীয় মূল্য দেয়া হয়, যা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। এটি সোলার বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশ্ন : কমিউনিটি সোলার মডেলের গুরুত্ব কী?
জাভেদ হোসেন : কমিউনিটিভিত্তিক সোলার মডেল দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। গ্রাম, কৃষি এলাকা বা শহরের ব্লকভিত্তিক যৌথ উদ্যোগে সোলার স্থাপন করা গেলে খরচ কমে এবং ব্যবহারের সুযোগ বাড়ে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশ্ন : এতে গ্রামীণ অর্থনীতি কিভাবে উপকৃত হবে?
জাভেদ হোসেন : সেচপাম্প, ক্ষুদ্র শিল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলো সরাসরি বিদ্যুৎ পাবে। ডিজেলনির্ভরতা কমবে, উৎপাদন খরচ কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। একই সাথে সঞ্চালন ক্ষতিও কমে যাবে।
প্রশ্ন : ভবিষ্যতে ব্যাটারি প্রযুক্তির ভূমিকা কী হতে পারে?
জাভেদ হোসেন : ব্যাটারি প্রযুক্তি সাশ্রয়ী হলে সোলারের কার্যকারিতা বহুগুণে বাড়বে। দিনের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে রাতে ব্যবহার করা যাবে। এতে গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রশ্ন : বর্তমান নীতিমালার মূল সীমাবদ্ধতা কী?
জাভেদ হোসেন : বর্তমান নীতিমালা পরস্পরবিরোধী। একদিকে সরকার জ্বালানিতে ভর্তুকি দিচ্ছে, অন্যদিকে সোলারের ওপর উচ্চ কর আরোপ করছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে একটি অদক্ষ ও ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে।
প্রশ্ন : সামনে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত পথ কী হওয়া উচিত?
জাভেদ হোসেন : বাংলাদেশকে একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমদানিনির্ভর ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবস্থায় থাকবে, নাকি বিকেন্দ্রীভূত সৌরভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর হবে। সঠিক নীতিমালা, কর হ্রাস, ফিড-ইন ট্যারিফ এবং সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশ একটি টেকসই, সাশ্রয়ী ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারবে।



