ইরানের রাডার-ড্রোন ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত আইআরজিসির

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের গোরুক শহরে ও কেশম দ্বীপে দেশটির রাডার ও ড্রোন ঘাঁটিতে ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এর জবাবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরোক্ষ আলোচনা চলার মধ্যেই দুই পক্ষের মধ্যে সীমিত পর্যায়ে হামলা-পাল্টাহামলা শুরু হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম এক্স এ এক পোস্টে সেন্টকম জানিয়েছে, রোববার ইরানের পারস্য উপসাগর উপকূলে আঘাতগুলো হানা হয়। সেন্টকম বলেছে, ‘এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আগ্রাসী পদক্ষেপের জবাব দিয়েছে, যার মধ্যে আছে একটি মার্কিন এমকিউ-ওয়ান ড্রোন ভূপাতিত করা যেটি আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল। ‘যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিমানগুলো দ্রুত জবাব দিয়ে ইরানের এয়ার ডিফেন্স, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং দু’টি একমুখী অ্যাটাক ড্রোন ধ্বংস করে দিয়েছে। এগুলো এই অঞ্চলের জলপথ দিয়ে চলাচলরত জাহাজগুলোর জন্য পরিষ্কার হুমকি তৈরি করেছিল।’

সেন্টকম জানিয়েছে, তারা চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও স্বার্থ রক্ষা করা অব্যাহত রাখবে। এদিকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের হরমোজগান প্রদেশের সিরিক দ্বীপে একটি যোগাযোগ টাওয়ারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা জানিয়েছে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। খবর আল-জাজিরার।

তেমনি ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাতে আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমোজগান প্রদেশের সিরিক দ্বীপে অবস্থিত যোগাযোগ টাওয়ারে মার্কিন সেনাবাহিনীর হামলার প্রায় এক ঘণ্টা পর আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর ইউনিটগুলো ওই হামলার উৎসস্থল হিসেবে চিহ্নিত বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মার্কিন বাহিনীর আগ্রাসনের পর আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্সের যোদ্ধারা হামলার উৎসস্থল বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে এবং পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়।’ তবে হামলার শিকার বিমানঘাঁটিটি কোথায় অবস্থিত, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি আইআরজিসি।

এর আগে কুয়েতে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরো বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরানের সাথে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকার ও শান্তি আলোচনার প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। ওয়াশিংটনের সাথে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা চলছে না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ অভিযোগ করেন, ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ জারি রাখা এবং ইসরাইলকে লেবাননে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ হওয়া স্পষ্টতই যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেয়া এক পোস্টে গালিবাফ লিখেছেন, ‘নৌ-অবরোধ বহাল রাখা এবং গণহত্যাকারী ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর লেবাননে যুদ্ধাপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়া স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে না।’ মার্কিন প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটি মূল্য থাকে এবং সেই হিসাব চুকানোর সময়ও আসে। সবকিছুই যথাস্থানে ফিরে আসবে।’

তেমনি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাকেই তার সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে তেহরান বর্তমানে ওয়াশিংটনের সাথে কোনো ধরনের আলোচনায় জড়িত নেই। বাকেই বলেন, ‘পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে কখন কী পদক্ষেপ নিতে হবে তা আমাদের জানা আছে। পারমাণবিক কর্মসূচির বিস্তারিত বিষয় নিয়ে এই মুহূর্তে কোনো আলোচনা হয়নি। এই পর্যায়ে আমাদের প্রধান ও একমাত্র অগ্রাধিকার হলো যুদ্ধ বন্ধ করা।’

মুখপাত্র বাকেইও মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে বলেন, ‘এমনকি আজ সকালেও’ যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় তেহরান যে কোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

লেবাননে যুদ্ধবিরতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো চুক্তি হবে না বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে ইরান। দেশটি ঘোষণা দিয়ে বলেছে, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে লেবাননে যুদ্ধবিরতি বজায় থাকা একটি ‘অপরিহার্য শর্ত’।

সোমবার সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাকেই তেহরানের এই অবস্থান স্পষ্ট করেন। ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘আমরা জোরালোভাবে বলতে চাই, যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে যেকোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা একটি আবশ্যকীয় শর্ত।’

উল্লেখ্য, গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে লেবাননে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা উপেক্ষা করে ইসরাইল সম্প্রতি তাদের সামরিক আগ্রাসন ও হামলা আরো জোরদার করেছে। ইসমাঈল বাকেই জানান, লেবাননের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো চুক্তি হতে পারে না। সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে বাঘাই অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। তিনি বলেন, ‘আজ (সোমবার) সকালেও মার্কিন বাহিনী যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।’ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি আরো বলেন, ‘ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তার প্রতিটি পদক্ষেপই আমরা গ্রহণ করবো।’

এপ্রিলের প্রথম দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে আর যুদ্ধ অবসানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তাদের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। কিন্তু আরো টেকসই একটি চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার মধ্যেই তারা মাঝে মাঝে হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়ছে। গত বৃহস্পতিবারও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর পর মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায় তেহরান। তখনও উভয়পক্ষ এবারের মতো প্রায় একই ধরনের বিবৃতি দিয়েছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা ঘটায়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এ যুদ্ধে প্রধানত ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে বন্ধ করে রাখায় জ্বালানির দাম বেড়ে গিয়ে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে।