- প্রকল্পটি ১০ বছরে বাস্তবায়নে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি
- বাস্তবায়নে বিদেশী ঋণসহ খরচ ৪ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা
- এডিপিতে খরচ করার ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়ার সুযোগ আছে : ড. জাহিদ
নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্রেন পরিচালনার জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ের চার হাজার ২৮২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এই প্রকল্পটি ১০ বছরে বাস্তবায়নের প্রস্তাবেও পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ থেকে আপত্তি দেয়া হয়েছে। প্রকল্পে মেরামতের জন্য ৫ বছরের বিষয়টি বাদ দিয়ে ৫ বছরে প্রকল্পটি করার জন্য বলেছে। আর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশী ও বিদেশী মিলে ৩৭ জন পরামর্শক এবং ৫০ জন সাপোর্ট স্টাফ কমিয়ে আনার জন্য বলেছে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। এমনকি বিভিন্ন খাতে ব্যয়কেও যৌক্তিক পর্যায়ে এনে প্রস্তাবনা পুনর্গঠন করার জন্য বলেছে বলে রেলওয়ে মন্ত্রণালয় ও ভৌত অবকাঠামো বিভাগ থেকে জানা গেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদেরকে আরো বেশি যতœবান হতে হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কোনো প্রকল্প নেয়া ঠিক হবে না।
রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, বিশ্বজুড়ে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে বৈদ্যুতিক ট্রেন পরিচালনা করা হয়। রেল পরিচালনায় আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে রেলকে ডিজেল ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন থেকে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনে পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারই অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এবং টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত রেলপথে ইলেকট্রিক ট্রেন পরিচালনার জন্য জিওবি অর্থায়নে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ ডিজাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে বৈদ্যুতিক ট্রেন পরিচালনার প্রথম পর্যায় হিসেবে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত কমিউটার রেল চালু করার জন্য প্রকল্পটি প্রেরণ করা হয়েছে। ট্রেন পরিচালনার জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক এডিবি ও ইআইবির ঋণ সহায়তায় চার হাজার ২৮২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে এই প্রস্তাবনায়। যেখানে বাংলাদেশে সরকারের এক হাজার ৪৫২ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ থাকবে দুই হাজার ৮৩০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। প্রস্তাবনায় মেয়াদ ধরা হয়েছে ৩১ জুলাই ২০১৬ হয়ে ৩০ জুন ২০৩৬ পর্যন্ত ১০ বছর।
প্রকল্পের আওতায় কাজ
প্রকল্প প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনা কমিশনকে রেলের প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলীর তথ্য বলছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পটির মূলত তিনটি অম্পোনেন্ট রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যমান ৫২.৩২ কিলোমিটার রেলপথে (১৮৬ ট্রাকে কি. মি.) কন্ট্রোল সেন্টারসহ ওভারহেড ভ্যাটেনারি সিস্টেম তৈরি করা। ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) কারখানার ডিটেইল ডিজাইন তৈরি ও কারখানা নির্মাণ এবং ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) কেনা। এ ছাড়া প্রকল্পে প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিট, সুপারভিশন কন্সালটেন্সি সার্ভিস ও ওয়ার্কশপের জন্য ১২ একর ভূমি অধিগ্রহণ।
প্রকল্পের বাস্তবায়ণ নিয়ে রেলওয়ে
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রকল্পের মেয়াদ ১০ বছর জুলাই ২০১৬ হতে জুন ২০৩৬ পর্যন্ত। বাস্তবায়ন কার্যক্রম তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত। ১ম পর্যায় ৪ বছরে নির্মাণকাল এই রেললাইনের। পরবর্তী এক বছর ত্রুটিজনিত দায়ের মেয়াদকাল। আর পরবর্তী ৫ বছর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণকাল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পে পরামর্শক খাতে ৮৭ জন ও খরচে আপত্তি
প্রকল্পে ৯ জন আন্তর্জাতিক পরামর্শক, ২৮ জন জাতীয়/আন্তর্জাতিক পরামর্শক ও ৫০ জন সাপোর্টিং স্টাফ এই সংস্থান রাখা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ একটি রুটিন কার্যক্রম বিধায় জমি অধিগ্রহণ বিশেষজ্ঞ প্রস্তাবটি বাদ দিতে বলা হয়। বৈদেশিক পরামর্শক ও সাপোর্টিং স্টাফ যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণের জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি জয়দেবপুরে ১২ একর জমি অধিগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। যার জন্য ব্যয় হবে ১৩৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব জমি ব্যবহার করা যায় কি না তা পরীক্ষা করতে বলা হয়। রেলওয়ের জমি পাওয়া না গেলে যৌক্তিক পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রকল্পের ব্যাপারে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ
এই প্রকল্পের জন্য মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়ের সংস্থান রাখার সুযোগ নেই। এ কাজ বাস্তবায়নকারী সংস্থার রুটিন কাজ। তবে দক্ষ জনবলের অভাব এবং অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকলে প্রয়োজনে প্রকল্পের শেষে উক্ত কাজের জন্য নতুন প্রকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রকল্পের ত্রুটিজনিত দায়ের মেয়াদ বাদ দিতে বলা হয়েছে। আর প্রকল্পের মেয়াদ জুলাই ২০২৬ হতে জুন ২০৩১ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সংস্থান করে প্রকল্প প্রস্তাবনা সংশোধন করতে বলা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে আমাদের প্রকল্প নিতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প নেয়া ঠিক হবে না। আর এ ধরনের বড় ব্যয়ের প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের উচিত ফিজিবিলিটি স্টাডিটা ভালো করে করা। যাতে সঠিকভাবে ব্যয় নিরূপণ করা যায়। তিনি বলেন, আমাদেরকে খরচের ব্যাপারে আরো সংযত হতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি একটা বড় জায়গা যেখানে সাশ্রয়ী হওয়ার প্রচুর সুযোগ আছে। ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি দিতে হবে। এটা এমন তো কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। তিনি বলেন, প্রকল্পের সমীক্ষাটা ঠিক মতো না করে অনুমোদন দেয়ার কারণে মাঝপথে এসে খরচ বেড়ে যায়। আর বিদেশী ঋণের প্রকল্প হলে সেটা বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে সুদ গুনতে হবে আরো বেশি হারে।



