কোরবানির চামড়া নিয়ে সঙ্কট দাম নেই, ক্রেতাও নেই

Printed Edition
ময়মনসিংহে ক্রেতা নেই,  ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে চামড়া : নয়া দিগন্ত
ময়মনসিংহে ক্রেতা নেই, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে চামড়া : নয়া দিগন্ত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের চামড়া খাত ক্রমেই সঙ্কটের মুখে পড়ছে। সরকার কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। রাজশাহী, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর ও কুষ্টিয়া থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, চামড়ার বাজারে ক্রেতাসঙ্কট, অস্বাভাবিক কম দাম এবং সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয়ের চাপে বিপাকে পড়েছেন কোরবানিদাতা, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। অনেক এলাকায় চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাদরাসা-এতিমখানায় দান করা হয়েছে। কোথাও কোথাও নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে মানুষ।

রাজশাহীতে গরুর চামড়া ২০০-৪০০ টাকা, ছাগলের ১০-২০ টাকা

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এবারো রাজশাহীতে হতাশার চিত্র দেখা গেছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় এবং ছাগলের চামড়া মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকায়। এতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন সাধারণ কোরবানিদাতা, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

ঈদের দিন নগরীর রেলগেট এলাকা এবং পরদিন পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর মোকাম ঘুরে দেখা যায়, চামড়া কেনাবেচায় আগের মতো সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাক্সিক্ষত দাম পাননি। কেউ কেউ আবার ক্রেতা না পেয়ে চামড়া দান করে দিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী জেলা ও মহানগর এলাকায় এবার প্রায় পৌনে চার লাখ পশু কোরবানি হয়েছে। তবে এসব পশুর চামড়া কতটুকু সংগ্রহ হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসেব নেই। নগরীর পদ্মা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ফজলুল করিম বলেন, গত বছরও গরুর চামড়ার দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ছিল। এবারো তেমন, কোনো পরিবর্তন হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা পাওয়াও যায়নি।

রায়পাড়া এলাকার আবু জাফর বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো ব্যবসায়ীর দেখা পাননি। পরে বাধ্য হয়ে স্থানীয় একটি মাদরাসায় চামড়া দিয়ে আসেন। আমবাগান এলাকার তরিকুল আলমের ভাষ্য, কোরবানির চামড়ার অর্থ সাধারণত গরিব ও অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। কিন্তু চামড়ারই যদি মূল্য না থাকে, তাহলে সেই সামাজিক কর্মটুকুও পালন করা সম্ভব হয়নি।

চামড়ার বাজার ধসের প্রভাব পড়েছে মাদরাসাগুলোতেও। এক মাদরাসা অধ্যক্ষ জানান, চামড়া সংগ্রহ, লবণ দেয়া, পরিবহন ও সংরক্ষণের খরচ অনেক সময় বিক্রয়মূল্যের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান আগের মতো চামড়া সংগ্রহে আগ্রহী নয়।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি শিল্পের সঙ্কট, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে বছরের পর বছর ধরে এ খাত সঙ্কটের মধ্যেই রয়েছে।

হোসেনপুরে চামড়ার ক্রেতা নেই, দিয়ে দেয়া হচ্ছে মাদরাসা ও এতিমখানায়

হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক এলাকায় ঈদের দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কোনো ক্রেতার দেখা মেলেনি। ফলে কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ চামড়া বিক্রি না করে মাদরাসা ও এতিমখানায় দান করে দিয়েছেন।

উপজেলার আড়াইবাড়িয়া ইউনিয়নের কোরবানিদাতা কামরুল হাসান বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো ক্রেতা পাইনি। স্থানীয় মৌসুমি ব্যবসায়ী রাজিব মিয়া জানান, তিনি কয়েকটি চামড়া সংগ্রহ করলেও বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত মাদরাসায় দিয়ে দিয়েছেন। এতে তার উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

মৌসুমি ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, কয়েক বছর আগেও কোরবানির পর বাজারে চামড়া কিনতে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যেত। অনেকেই আগেভাগে দরদাম ঠিক করে রাখতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। চামড়াজাত পণ্যের দাম বাড়লেও কাঁচা চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

জিনারী গ্রামের মঞ্জুরুল হক জানান, প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের গরুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মাদরাসায় দান করে দিয়েছি। তিনি বলেন, এক দশক আগেও একই ধরনের গরুর চামড়া এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো। এখন সেই দাম কয়েক গুণ কমে গেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী হিরন মিয়ার অভিযোগ, সরকারি মূল্য নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয় না। সিন্ডিকেটের কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি চামড়ায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

কুষ্টিয়ায় চামড়ার ব্যবসায় মন্দাভাব, প্রধান কারণ ল্যাম্পি আক্রান্ত

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, কুষ্টিয়ার চামড়া বাজারেও এবার মন্দাভাব লক্ষ্য করা গেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, ল্যাম্পি রোগে আক্রান্ত পশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় চামড়া কেনাবেচায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। আড়তদাররা বলছেন, ল্যাম্পি আক্রান্ত চামড়া ট্যানারিগুলো গ্রহণ করতে চায় না। ফলে তারা এসব চামড়া কিনতে আগ্রহী নন।

কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া চামড়া মোকামে দেখা গেছে, বড় আকারের ভালো মানের কিছু চামড়া ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায় বিক্রি হলেও অধিকাংশ চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হয়েছে। ল্যাম্পি আক্রান্ত অনেক চামড়ার দাম নেমে এসেছে ১০০ থেকে ২০০ টাকায়।

চামড়া ব্যবসায়ী শামসুল ইসলাম জানান, এ বছর বাজারে চামড়ার সরবরাহও তুলনামূলক কম। তার দাবি, প্রায় ৭০ শতাংশ গরুর চামড়ায় ল্যাম্পির ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে। ফলে ট্যানারিতে বিক্রির অনিশ্চয়তায় আড়তদাররা চামড়া কিনছেন না।

তবে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: আল মামুন হোসেন মণ্ডল বলেন, অনেক ব্যবসায়ী ল্যাম্পির বিষয়টিকে চামড়ার দাম কমানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার মতে, বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকি থাকলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

ব্যবসায়ীরা আরো বলেন, ব্যাংক ঋণের সুবিধা না থাকা, ট্যানারির কঠোর শর্ত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত ক্রেতার কারণে চামড়া খাত দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে। তাদের মতে, চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, বিপণন ও রফতানি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া না হলে দেশের সম্ভাবনাময় এ শিল্প আরো পিছিয়ে পড়বে।

ময়মনসিংহে চামড়ার হাট ক্রেতাশূন্য, বিপাকে ব্যবসায়ীরা

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, কোরবানির ঈদকে ঘিরে যেখানে চামড়ার হাট জমজমাট থাকার কথা, সেখানে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ হাটে দেখা গেল উল্টো চিত্র। ক্রেতাশূন্য বাজার, স্তূপ হয়ে পড়ে আছে চামড়া। এতে হতাশায় ডুবছেন ব্যবসায়ীরা। গত শনিবার সাপ্তাহিক হাট বসার দিন হলেও ট্যানারি মালিক ও পাইকারদের অনুপস্থিতিতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে বাজারটি।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম বড় এই চামড়ার হাটে প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে হাজারো ব্যবসায়ীর সমাগম ঘটে। ময়মনসিংহ ছাড়াও নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ থেকে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে আসেন এখানে। কিন্তু এবার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন- চামড়া আছে, কিন্তু নেই ক্রেতা।

হালুয়াঘাট থেকে ৪৬টি চামড়া নিয়ে আসা ব্যবসায়ী রামলাল রবি দাস বলেন, আজ বড় বাজার, কিন্তু একজন বেপারিও নেই। ১০০ থেকে ৭০০ টাকায় কাঁচা চামড়া কিনে লবণ ও শ্রমিক খরচ দিয়ে এখন বিক্রি করতে পারছি না। টানা কয়েক বছর লস দিতে দিতে এখন এ ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার চিন্তা করছি। একই হতাশা ব্যক্ত করেন মৌসুমী ব্যবসায়ী সুধর রবিন দাস। তিনি বলেন, ‘মাল নিয়ে আইছি, কিনুয়া লোক নাই। চামড়া রেখে যাচ্ছি, দেখি পরের বাজারে কী হয়।’

অভিজ্ঞ পাইকার মো: আবদুল কাদির বলেন, ‘সরকার দাম ঠিক করে দিলেও বাস্তবে সেই দাম পাওয়া যায় না। ৩৫ বছরের ব্যবসা জীবনে এমন সঙ্কট খুব কম দেখেছি। ট্যানারি মালিকরা যদি ন্যায্য দাম না দেন, তাহলে আমাদের পথে বসা ছাড়া উপায় কী।’