নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে পশুর হাট ও কোরবানির বর্জ্য অপসারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আব্দুস সালাম প্রথম দিনের বর্জ্য আট ঘণ্টার মধ্যে এবং উত্তর সিটির প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান ১২ ঘণ্টার আগেই অপসারণের ঘোষণা দিলেও সময়মতো তা করতে পারেননি। এ কারণে ঈদের পরদিনও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির বর্র্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়া সময়মতো কোরবানির পশুর হাটের বর্জ্য অপসারণেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে দুই সিটি। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং নিজে মাঠে নেমে পর্যবেক্ষণ করে এর সত্যতা পেয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অবশ্য গতকাল সিটির বিভিন্ন সড়ক ও হাট পরিদর্শন করে প্রতিটি এলাকার রাস্তায় পরিচ্ছন্নতার চিত্র দেখা গেছে।
পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির বর্জ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অপসারণের ঘোষণা দিলেও দ্বিতীয় দিন শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। ২০ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোথাও সড়কের পাশে জমে ছিল পশুর উচ্ছিষ্ট, আবার কোথাও রক্ত ও ভুঁড়ির বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছিল দুর্গন্ধ। উত্তর সিটির মিরপুর, শাহজাদপুর, বনানী ও গুলশানের কিছু এলাকায় এখনো বর্জ্যরে স্তূপ দেখা যায়। একইভাবে দক্ষিণ সিটির বনশ্রী, খিলগাঁও, সবুজবাগ, জিগাতলা, চকবাজার, হাজারীবাগ ও বকশীবাজারের বিভিন্ন সড়কেও পড়ে থাকতে দেখা যায় কোরবানির উচ্ছিষ্ট অংশ।
সরেজমিন পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর : শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র দেখতে বের হন। এ সময় তিনি বর্জ্য অপসারণের চিত্র সন্তোষজনক মনে না হওয়ায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এ সময় তার সাথে থাকা স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং কোরবানির পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দেখতে বেরিয়েছিলেন। তিনি কয়েকটি স্থানে বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রিন রোড, ফার্মগেট ও কাওরান বাজার এলাকায় রাস্তায় ময়লা জমে থাকায় দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া আরো ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের অপসারণ করে তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত এবং দায়িত্বে অবহেলার জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ডিএসসিসি : কোরবানির পশুর হাট ও কোরবানির বর্জ্যরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বর্জ্য অপসারণের দাবি করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গত ২৮ মে ঈদের দিন থেকে ৩০ মে রাত ১২টা পর্যন্ত মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে মোট ৩৬ হাজার ৮৬ টন বর্জ্য চূড়ান্তভাবে ডাম্পিং করেছে সংস্থাটি। যেখানে ডিএসসিসির প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৩ হাজার ৯৪২ টন। ডিএসসিসির তথ্য মতে, প্রথম দিন ১৪ হাজার ৮১৪ টন, দ্বিতীয় দিন আট হাজার ৯৭৭ টন এবং তৃতীয় দিন ১২ হাজার ২৯৫ টন বর্জ্য অপসারণ করেছেন তাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
গতকাল নগর ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আবদুস সালাম বলেন, এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে ডিএসসিসির নিজস্ব ও পিসিএসপি-সহ মোট ১৩ হাজার ৪৫৩ জন কর্মী মাঠপর্যায়ে দিনরাত কাজ করেছেন। বর্জ্য পরিবহনে ৩৮২টি বিশেষ যান-যন্ত্রপাতিসহ মোট দুই হাজার ১১৭টি ছোট-বড় গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছে। ডিএসসিসি নির্ধারিত ৩৫৭টি স্থানে গত তিন দিনে মোট ১৭ হাজার ৩১৫টি পশু কোরবানি করা হয়েছে।
নাগরিক সচেতনতা ও সহযোগিতা : প্রশাসক জানান, ঈদের আগে জাতীয় দৈনিকে গণবিজ্ঞপ্তি, টিভিসি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে ব্যাপক মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা চালানো হয়েছিল। নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করতে ৭৫টি ওয়ার্ডে ৪৬ টন ব্লিøচিং পাউডার, ২১০ গ্যালন (এক হাজার ৫০ লিটার) স্যাভলন এবং এক লাখ ৪০ হাজার বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ বিতরণ করা হয়। সচেতন নাগরিকরা বর্জ্য ব্যাগে ভরে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দারুণ সহযোগিতা করেছেন। সচেতনতার এ ইতিবাচক পরিবর্তন ধরে রেখে একটি পরিচ্ছন্ন ঢাকা বিনির্মাণ সম্ভব।
ইজারাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা : কোরবানির ১১টি অস্থায়ী হাটের বর্জ্য অপসারণে শর্ত অনুযায়ী ইজারাদাররা নির্ধারিত সময়ে কাজ না করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডিএসসিসি প্রশাসক। জনভোগান্তি এড়াতে সিটি করপোরেশন নিজ দায়িত্বে এসব বর্জ্য অপসারণ করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, যা সামগ্রিক কার্যক্রমকে কিছুটা শ্লথ ও চ্যালেঞ্জিং করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে শর্তভঙ্গকারী ইজারাদারদের জামানত বাজেয়াপ্ত ও কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামী বছর থেকে হাটের জামানতের অঙ্ক উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর ঘোষণা দেন; সেই সাথে জনভোগান্তি তৈরিকারীদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হবে না বলে সতর্ক করেন।
এক ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা : কোরবানির কার্যক্রম শেষ হলেও ডিএসসিসির তদারকি টিম এখনো মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে। ডিএসসিসি এলাকার কোথাও কোনো বর্জ্য জমে থাকতে দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর : ০১৭০৯৯০০৮৮৮ এবং ০২২২৩৩৮৬০১৪-এ জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। সংবাদ পাওয়ার মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ওই বর্জ্য অপসারণ করা হবে বলে জানান প্রশাসক।
ডিএনসিসি : ঈদের দিন থেকে শুরু করে ৭২ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মোট ১৮ হাজার ৮৪৪ টন বর্জ্য অপসারণ করেছে। এর মধ্যে ২৮ মে আট হাজার ৭৬ টন, ২৯ মে ছয় হাজার ৭১৪ টন এবং ৩০ মে চার হাজার ৫৪ টন বর্জ্য অপসারণ করেছে ডিএনসিসি।
ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম শনিবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তারা ৭২ ঘণ্টার সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী নগরবাসী, সাংবাদিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় উত্তর সিটি করপোরেশনের কোরবানির পশুর বর্জ্য প্রায় অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছি। ডিএনসিসির ইজারাকৃত ১০টি হাটের মধ্যে চারটি গরুর হাটের বর্জ্য ইতোমধ্যে পরিষ্কার করা হয়েছে বাকি ছয়টি হাটের বর্জ্য পরিষ্কারের কাজ চলছে ।



