শহরের স্বাস্থ্যসেবা : নিঃস্ব নাগরিকদের প্রতি অবহেলা ও কর্তৃপরে ভিন্ন ব্যাখ্যা

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

রাজধানীর নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতালই শেষ ভরসা। কিন্তু অতিরিক্ত রোগীর চাপ, সীমিত অবকাঠামো, আর্থিক সঙ্কট ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতার কারণে সে ভরসাস্থলও অনেক সময় অপ্রতুল হয়ে উঠছেÑ এমন অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের। অন্য দিকে হাসপাতাল কর্তৃপ বলছে, সীমিত শয্যা ও জনবল নিয়েই তারা সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছেন; সমস্যা মূলত অতিরিক্ত চাপের।

গেন্ডারিয়া থেকে আসা অটোরিকশাচালক আনোয়ার হোসেন তার ৭০ বছর বয়সী মা জবেদা বেগমকে নিয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। তার অভিযোগ, ডাক্তার দু’টি পরীা দিতে বলেছেনÑ একটি হাসপাতালে করা গেলেও আরেকটি বাইরে (ধানমন্ডির একটি বেসরকারি কিনিকে) করতে হবে। তার দাবি, সরকারি হাসপাতালে করানোর অনুরোধ করা হলেও সুযোগ পাননি। অন্য দিকে চিকিৎসকের বক্তব্য, নির্দিষ্ট পরীার সুবিধা ওই হাসপাতালে নেই, তাই বাইরে করাতে হয়েছে। দিনের পর দিন হাসপাতালে কাটানো, আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়াÑ এ সবই নিম্নœআয়ের রোগীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের বস্তি ও নিম্নœআয়ের এলাকাগুলোতে রোগের বড় কারণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, পুষ্টিহীনতা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েÑ যা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। বস্তি এলাকায় শিশু মৃত্যুহার জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি বলেও বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ আছে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, যক্ষ্মা ও হেপাটাইটিসের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগ সেখানে বেশি দেখা যায়। অপরিশোধিত পানি, খোলা নর্দমা ও ঘনবসতির কারণে সংক্রমণ ছড়ায় দ্রুত।

বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে পরিবেশ দূষণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির কারণে বিপুলসংখ্যক অকালমৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সাথে জরিপভিত্তিক তথ্য বলছে, অসুস্থ হলে অনেক মানুষ প্রথমে সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে ফার্মেসি বা অনানুষ্ঠানিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেনÑ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে। ফলে অনেক েেত্রই চিকিৎসা দেরিতে শুরু হয়, যা জটিলতা বাড়ায়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালও এই চাপে আক্রান্ত। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মে ২০২৬-এ দালাল ও অনিয়ম প্রতিরোধে অভিযান চালিয়ে ৪৯ জনকে আটক করা হয়েছে। রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে শয্যাসংকট, ফোরে রোগী রাখা এবং ব্যবস্থাপনা জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। কিছু েেত্র বাইরের পরীাগারে পাঠানোর বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ কমিশন-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তুললেও তা প্রমাণসাপে এবং কর্তৃপ এসব অভিযোগ নিয়মিত অস্বীকার করে থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসা কর্মকর্তা বলেন, সরকারি হাসপাতাল দরিদ্রদের প্রধান ভরসা হলেও সীমিত সুবিধার কারণে সব পরীা-চিকিৎসা এখানে সম্ভব হয় না। তার মতে, বিভিন্ন চক্র সক্রিয় থাকার বিষয়টিও পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। তবে এসব অভিযোগ তদন্তসাপে।

অন্যদিকে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাসপাতালটি মূলত নি¤œআয়ের মানুষের জন্য কাজ করে; আগত রোগীদের বড় অংশই দরিদ্র। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশিÑ প্রায় ২৬০০ বেডের বিপরীতে প্রায় ৪০০০ রোগী ভর্তি থাকায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। এ অবস্থায় অনেক সময় মধ্যবিত্ত রোগীকেও ফোরে থাকতে হয়। তার দাবি, অজ্ঞাত ও পরিচয়হীন রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা রয়েছে; সমাজকল্যাণ শাখার মাধ্যমে ওষুধ ও সহায়তা দেওয়া হয়। মৃত অজ্ঞাত ব্যক্তিদের লাশ পরিবহন ও দাফনের েেত্রও নির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়।

দালাল প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় অভিযান পরিচালিত হয়। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দালাল শনাক্ত করা কঠিনÑএমন বাস্তবতাও তুলে ধরেন তিনি। সম্প্রতি প্রচারিত কিছু সংবাদকে কর্তৃপ অতিরঞ্জিত বলে উল্লেখ করলেও দালাল দমন কার্যক্রম অব্যাহত আছে বলে দাবি করেন।

সব মিলিয়ে চিত্রটি দ্বিমুখী। একদিকে রোগীর অভিযোগÑ অবহেলা, অতিরিক্ত ব্যয় ও হয়রানি; অন্য দিকে কর্তৃপরে বক্তব্যÑঅপ্রতুল অবকাঠামো ও বিপুল চাপের মধ্যে সীমিত সম্পদে সেবা দেওয়ার চেষ্টা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, শহরের বস্তি এলাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, হাসপাতালের শয্যা ও পরীার সমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ রেফারাল ব্যবস্থা এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি দরিদ্র মানুষের আস্থার জায়গা হতে চায়, তবে শুধু অভিযোগ-প্রত্যাখ্যান নয়Ñ সমন্বিত নীতি, পর্যাপ্ত বাজেট ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা জরুরি। অন্যথায় নিঃস্ব নাগরিকদের জন্য সরকারি হাসপাতালই থেকে যাবে শেষ আশ্রয়, কিন্তু সেই আশ্রয়েও চাপ ও অনিশ্চয়তা কমবে না।