লালমোহনে বিলুপ্তির পথে উপকারী ভেন্না গাছ

Printed Edition
লালমোহনে বিলুপ্তির পথে উপকারী ভেন্না গাছ
লালমোহনে বিলুপ্তির পথে উপকারী ভেন্না গাছ

মাকসুদুর রহমান পারভেজ লালমোহন (ভোলা)

একসময় ভোলার লালমোহন উপজেলার গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় কিংবা পতিত জমিতে স্বাভাবিকভাবেই জন্মাত ভেন্না গাছ। স্থানীয়ভাবে ‘ভেরেন্ডা’ বা ‘ভেরন’ নামে পরিচিত এ গাছটি ছিল গ্রামীণ জীবনের পরিচিত ভেষজ সম্পদ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সে ভেন্না গাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ গাছের নাম কিংবা উপকারিতা সম্পর্কে তেমন জানেন না।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় গ্রামীণ মানুষ নানা রোগের ঘরোয়া চিকিৎসায় ভেন্না গাছের পাতা, বীজ ও তেল ব্যবহার করতেন। বাতব্যথা, ফোঁড়া, পোড়া, চুলকানি কিংবা মাথা ঠাণ্ডা রাখার জন্য ভেন্না পাতার রস ও বীজ থেকে তৈরি তেল বেশ কার্যকর বলে ধরা হতো।

সম্প্রতি উপজেলার লালমোহন ইউনিয়নের ফুলবাগিচা এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের একটি আবাসন প্রকল্পে কয়েকটি ভেন্না গাছ দেখা গেছে। আবাসনের বাসিন্দা আবু ইউসুফ (৬০) জানান, আগে গ্রামে প্রায় সর্বত্রই এ গাছ দেখা যেত। পুকুরপাড়, ক্ষেতের আইল কিংবা পতিত জমিতে কোনো যতœ ছাড়াই ভেন্না গাছ জন্মাত। ভেন্নার বীজ থেকে তেল বের করে চুলকানি বা পোড়া স্থানে ব্যবহার করা হতো, আবার পাতার রসও নানা রোগে কাজে লাগানো হতো। তিনি বলেন, ‘আমাদের আবাসনের এ গাছগুলো কেউ লাগায়নি, নিজ থেকেই জন্মেছে। কিন্তু এখন আশপাশে আর তেমন দেখা যায় না।’

আয়ুর্বেদ ও প্রাচীন ভেষজ চিকিৎসায়ও ভেন্না গাছের গুরুত্ব অনেক। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, চোখ ওঠা রোগে ভেন্না পাতার রস হালকা গরম করে ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়। পেট ব্যথা হলে কচিপাতা সেদ্ধ করে খেলে উপশম মিলতে পারে। রাতকানা রোগে ভেন্না পাতা ভেজে খাওয়ার কথাও লোকজ চিকিৎসায় উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া নারীদের তলপেটের ব্যথা কমাতে ভেন্না পাতা গরম করে সেঁক দেয়ার প্রচলন ছিল গ্রামাঞ্চলে। চর্মরোগ, খোসপাঁচড়া ও প্রস্রাব কমে যাওয়ার সমস্যায়ও ভেন্না গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে।

লালমোহন উপজেলা হাসপাতালের ইউনানি মেডিক্যাল অফিসার ডা: ইউসুফ হোসেন জানান, ‘ভেন্না গাছের বীজ, পাতা ও মূল ইউনানি চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে বীজ থেকে তৈরি ক্যাস্টর অয়েল কোষ্ঠকাঠিন্য ও বাতব্যথার চিকিৎসায় কার্যকর। এ ছাড়া এর আঠালো রস একজিমা ও বিভিন্ন চর্মরোগে উপকারী।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এটি শক্তিশালী রেচক হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত ব্যবহার করা ঠিক নয়।

স্থানীয়দের মতে, পরিবেশগত পরিবর্তন, বসতবাড়ি ও কৃষিজমির ধরন বদলে যাওয়ায় ভেন্না গাছ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উদ্ভিদ বিলুপ্তির ঝুঁঁকিতে পড়েছে। সচেতনতা ও উদ্যোগ থাকলে আবারো এ উপকারী গাছটি গ্রামবাংলার আঙিনায় ফিরে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।