- ‘মিড ডে মিল’ এর খাবার পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে প্রেরণ
- যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো খাবার গ্রহণ করবে না স্কুল কর্তৃপক্ষ
প্রাথমিকে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বাড়াতে এবং ঝরে পড়া রোধ করতে মিড ডে মিল প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এখন সেই খাবারে তৈরি হয়েছে মৃত্যুঝুঁকি। কিছু ঠিকাদার অর্থের লোভে কোমলমতি শিশুদের মুখেই যেন বিষ তুলে দিচ্ছে। বিশেষ করে বাসি ডিম ও পচা কলা খেয়ে দেশের অনেক স্থানেই শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সরকার ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে মিড ডে মিল চালু করলেও কিছু অসাধু সরবরাহ বেশি লাভের আশায় শিশুদেরই বিপদের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। মান নিয়ে গত কয়েক দিনে সারা দেশ থেকে অভিযোগ আসার পর গতকাল রোববার খাবারের কিছু নমুনা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) পাঠিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই)। ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে স্কুল পরিদর্শন এবং ব্যাপক তদন্তও শুরু করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
এর আগে মাদারীপুরে মিড ডে মিলের খাবার খেয়ে কয়েকজন শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার সূত্রপাত হয়। পরে ডিপিই থেকে একটি দল তাৎক্ষণিকভাবে মাদারীপুরে গিয়ে খোঁজখবর নেন। একই সাথে রংপুর বিভাগে দুই-একটি স্কুলে একই সমস্যার খবর আসে। তবে এই সংখ্যা খুবই সামান্য। কিন্তু তারপরেও বিষয়টি যেহেতু শিশুদের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর তাই শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন প্রকল্পের সাথে জড়িত কর্মকর্তারা।
মাদারীপুর থেকে একটি সূত্র নয়া দিগন্তকে জানায়, ইতোমধ্যে মাদারীপুরে সরবরাহকৃত খাবারের মান নি¤œ মানের হওয়ার কারণে সেখানে জেলা প্রশাসক নিজেই বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজে বাদি হয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দাখিল করেছেন। আর ডিপিই থেকে ঠিকাদারকে কেন তার সাথে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করা হবে না সেই মর্মে কারণ দর্শাও নোটিশও দেয়া হয়েছে।
এ দিকে স্কুলে স্কুলে খাবার পরিবেশ করার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন নয়া দিগন্তকে জানান, খাবারের তালিকায় সপ্তাহের তিন দিনই একটি করে সেদ্ধ ডিম দেয়া হয়। এই ডিমের ওপরে মুরগির বিষ্ঠা লেগে থেকে। আর অনেক শিশু স্কুলে হাত না ধুয়েই ওই ডিম ছিলে খেয়ে নেন। এতে জীবাণু সংক্রমের শিকার হচ্ছে অনেক শিশু। আবার অনেক ঠিকাদার আগের রাতেই ডিম সেদ্ধ করে স্কুলে পৌঁছে দেয়। এতে অনেক ডিম পরিবহনে কিংবা অর্ধসেদ্ধ থাকায় নষ্ট হয়ে যায়। নষ্ট ডিম শিশুরা না বুঝে খেয়ে নিলে পেটে বিষক্রিয়া তৈরি হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বমি পাতলা পায়খানা এবং নানাবিধ পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে আমাদের কোমলমতি শিশুরা। একইভাবে পরিবহনের সময়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া কলাও খাওয়ানো হচ্ছে শিশুদের।
প্রকল্প সূত্র জানায়, দেশের আটটি বিভাগে ৬২ জেলায় মোট ১৫০টি উপজেলায় মিড ডে মিল প্রলল্প চালু করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ এর ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার ৪৫২ কোটি ৪১ লাখ ৫২ হাজার টাকা। গত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জন্য এই প্রকল্পে রবাদ্দ দেয়া হয়েছিল দুই হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। প্রকল্পে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৪১৯টি। আর মোট শিক্ষার্থী টার্গেট করা হয়েছে ৩১ লাখ ৩০ হাজার। তবে সরেজমিনে সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া গেছে ২৯ লাখ ৬০ হাজার। অবশ্য প্রকল্প এলাকায় প্রতিদিনই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই বিভাগের আট জেলার ১২টি উপজেলায় মিড যে মিল প্রকল্প চালু করার পর সেখানে ইতোমধ্যে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পেয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, মিড ডে মিলের আওতায় সপ্তাহে পাঁচ দিনই প্রাথমিকের এই ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আইটেমের খাবার দেয়া হয়। এর মধ্যে রোববার একটি বনরুটি (১২০ গ্রাম) এবং একটি সেদ্ধ ডিম, সোমবার বনরুটি এবং ইউএইচটি দুধ (২০০ গ্রাম), মঙ্গলবার ফর্টিফাইট বিস্কুট (৭৫ গ্রাম) এবং একটি কলা (১০০ গ্রাম)। বুধবার বনরুটি ও একটি সেদ্ধ ডিম এবং বৃহস্পতিবার বনরুটি ও সেদ্ধ ডিম। এইসব খাবার পরিবেশনে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার টেন্ডার আহ্বান করে (পিপিআর ২০০৮ এবং পিপিআর ২০২৪ অনুসারে) ফর্টিফাইট বিস্কুট এবং দুধ সরবরাহ করতে আট বিভাগের আট টন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। আর বাকি খাবার সরবরাহ করতে ১৫০ উপজেলাকে ২০ প্যাকেজে ভাগ করে ২০ জন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে।
গতকাল রোববার সকালে মিরপুরস্থ ডিপিইর প্রকল্পের কার্যালয়ে প্রকল্প কর্মকর্তা যুগ্মসচিব মুহাম্মদ হারুন আর রশীদ নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেককে জানান, শিশুদের মুখে আমরা যেকোনো মূল্যে ভালো এবং ভেজালমুক্ত খাবার তুলে দিতে চাই। আর এ জন্য যেখানেই কোনো খারাপ খাবারের তথ্য আমাদের কাছে আসে সেখানে আমরা নিজেরা চলে যাই সরেজমিনে দেখভাল করতে। তবে আমাদের এখন পর্যন্ত যতটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে সেখানে দেখেছি স্কুল পর্যায়ে অর্থাৎ শিশুদের এই খাবার রিসিভিং পয়েন্টে সঠিক তদারকি করা সম্ভব হলে ভালো এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশেষ করে ডিম দূর থেকে সংগ্রহ না করে বরং স্কুলের কোনো অভিভাবক কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে (অবশ্যই সঠিক মূল্য পরিশোধ সাপেক্ষে) সকাল বেলা যদি ডিমটি সেদ্ধ করে শিশুদের হাতে তুলে দেয়া যায় তাহলে ডিমটি গরম এবং এর গুণগত মানও ভালো থাকবে। একইভাবে পাকা কলা দূর থেকে পরিবহন না করে স্কুলের নিকটবর্তী দূরত্ব থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হলে কলার গুণগত মানও ভালো থাকবে। আর অন্যান্য খাবার বিস্কুট কিংবা রুটি বা পাস্তুরিত তরল দুধও যদি সঠিক মান যাচাই করে গ্রহণ করা হয় তাহলে সব খাবারের গুণগত মানও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অন্য দিকে কিছু বিব্রতকর তথ্যও প্রকল্প কর্মকর্তাদের কাছে এসেছে। যেমন দুই-একজন শিশু হয়তো স্কুল ফিডিংয়ের খাবারের কারণে অসুস্থ হচ্ছে না। অনেক সময়েই তারা অসুস্থ হচ্ছে স্কুলের পাশের দোকান বা ফেরিওয়ালার নিকট থেকে আচার কিংবা চটপটি ফুসকা জাতীয় খাবার খাওয়ার কারণে। বাইরের এসব নোংড়া ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতিও আমাদের সন্তানদের নিরুৎসাহিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও তাদের প্রতি তদারকি বাড়াতে হবে।
এ দিকে গত শনিবার নরসিংদীর বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি শহরের বাসাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলের খাবারের মান পর্যবেক্ষণ করেন। খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। খাবারের মানে উন্নতি না হলে কার্যাদেশ বাতিলেরও হুঁশিয়ারি দেন। শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ রুটিতে গন্ধ পান তিনি। প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে দু’টি নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকার ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, আমি নিজে বিদ্যালয়ে সাপ্লাইয়ারদের দেয়া মিড ডে মিলের খাবার পর্যবেক্ষণ করেছি, খাবারে কিছু ত্রুটি পেয়েছি। শিশুদের জন্য দেয়া খাবারে যাতে কোনো ত্রুটি না থাকে এবং শিশুরা যাতে খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসে, সে জন্যই আমরা সারাদেশে পর্যবেক্ষণ শুরু করেছি।



