আহসান হাবীব শিবচর (মাদারীপুর)
একসময় নদী-নালা আর নৌকাকেন্দ্রিক জীবনই ছিল বেদে সম্প্রদায়ের পরিচয়। সাপ খেলা, ঝাড়ফুঁক, সিঙ্গা লাগানো কিংবা ভেষজ ওষুধ বিক্রিই ছিল তাদের প্রধান পেশা। তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে বদলে যাচ্ছে সেই চিরচেনা জীবনধারা। জল ছেড়ে ডাঙ্গায় স্থায়ী বসতি গড়ছে বেদে পরিবারগুলো। সন্তানদের পাঠানো হচ্ছে স্কুল ও মাদরাসায়, আর যুবকরা যুক্ত হচ্ছেন বিভিন্ন পেশায়।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর-কাওড়াকান্দি এলাকার পরিত্যক্ত সড়কের পাশে প্রায় ২০ বছর ধরে বসবাস করছে বেদে সম্প্রদায়ের অন্তত অর্ধশত পরিবার। প্রায় আড়াই শতাধিক মানুষের এ বসতিতে এখন দেখা মিলছে স্থায়ী আবাসন, শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এবং পেশাগত বৈচিত্র্যের।
সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট ছোট খুপড়ি ঘরের পাশাপাশি অনেকে নির্মাণ করেছেন অপেক্ষাকৃত বড় ও উন্নত ঘর। পুরুষরা ভ্যান চালানো, রাজমিস্ত্রির কাজ, আইসক্রিম বিক্রি ও অন্যান্য শ্রমভিত্তিক পেশায় যুক্ত হয়েছেন। নারীদের মধ্যেও এসেছে পরিবর্তন; আগের মতো গ্রামে গ্রামে ঘুরে পণ্য বিক্রি বা চিকিৎসাসেবা দেয়ার প্রবণতা কমেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, আধুনিক যুগে ঝাড়ফুঁক বা সাপ খেলার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ায় পৈতৃক পেশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে জীবিকার তাগিদে বেশির ভাগ পরিবার নতুন পেশা বেছে নিয়েছে।
বেদে সম্প্রদায়ের সর্দার দয়াল সরদার বলেন, নদীকেন্দ্রিক জীবন এখন আর আগের মতো সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন এক স্থানে বসবাসের ফলে তারা স্থানীয় সমাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন। অনেকেই ভোটার হয়েছেন, স্থানীয় পরিবারে বৈবাহিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে শিক্ষায়। আগে শিশুদের লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না, এখন তারা নিয়মিত স্কুল ও মাদরাসায় যাচ্ছে। জোস্ননা বেগম নামে এক নারী জানান, আগে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সিঙ্গা লাগানো ও ওষুধ বিক্রি করতেন। এখন সেই পেশার চাহিদা কমে যাওয়ায় পরিবারের পুরুষেরা বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়েছেন এবং নারীরাও ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি বেদে পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে এখনো সর্দারপ্রথা থাকলেও জীবনযাত্রায় এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। শিশুদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি এবং পেশাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বেদে সম্প্রদায় ধীরে ধীরে সমাজের মূলধারায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে। মাদবরেরচর ইউনিয়নের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান রানু আক্তার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী এই মানুষগুলো স্থানীয় সমাজের সাথে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ। বিভিন্ন সময়ে তাদের সহায়তা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।



