অনলাইন প্রতারণা

আইনি দীর্ঘসূত্রতা ও লোকলজ্জায় আড়ালে থাকছে অপরাধ

Printed Edition

আব্দুল কাইয়ুম

একটি ভুয়া অনলাইন পেজ থেকে ২০ হাজার টাকার ল্যাপটপ কিনতে গিয়ে প্রতারিত হন বিশ্ববিদ্যালয় শিার্থী ফাহিম। তিনি জানান, মামলা করতে গেলে বারবার থানায় যেতে হবে, সঠিক বিচার হয় কি না সন্দেহ ছিল। আর জানাজানি হলে নানান কথা শুনতে হবে ও পড়াশোনার তি হবে। তা ছাড়া মাত্র ২০ হাজার টাকার জন্য আইনজীবীর পেছনে এর চেয়ে বেশি খরচ হয়ে যাবে ভেবে আর পদক্ষেপ নেইনি। এ ছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে পার্ট-টাইম হোম জব এবং সহজে মোটা অঙ্কের মুনাফার ফাঁদে পড়েন। তিনি বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ধাপে ধাপে কয়েক লাখ টাকা খুইয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং সামাজিক সম্মানের ভয়ে দীর্ঘ সময় বিষয়টি পুলিশকে জানাননি।

শুধু তারাই নয়, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণœ হওয়ার ভয়, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা এবং প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার কারণে অনলাইন প্রতারণার শিকার হয়েও বেশির ভাগ ভুক্তভোগী মামলা বা আইনি পদপে নেন না। বিভিন্ন গবেষণা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া প্রায় ৮৮ শতাংশ ভুক্তভোগীই শেষ পর্যন্ত কোনো আইনি পদপে গ্রহণ করেন না। পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অনলাইনে প্রতারিত হওয়া ব্যক্তিদের মাত্র ১২ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে থানায় বা সিআইডির সাইবার সেলে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তা ছাড়া মোট সাইবার অপরাধ ঘটনায় মাত্র চার শতাংশ শেষ পর্যন্ত নিয়মিত মামলা (এফআইআর) হয়েছে।

অপরাধ বিজ্ঞানী ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ভুক্তভোগীদের এই অনীহার জন্য বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সঙ্কট এবং জটিল প্রক্রিয়াকে দায়ী করেছেন। তারা বলছেন, অনলাইন প্রতারণার েেত্র ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রতিকার চান। যখন তারা দেখেন একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করতে গিয়ে নানা ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং অর্থ উদ্ধারের নিশ্চয়তা মিলছে না, তখন তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। সাইবার অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া আরো সহজ ও ভুক্তভোগীবান্ধব করা জরুরি। প্রতিটি থানায় সাইবার অপরাধের জন্য ডেডিকেটেড ডেস্ক এবং প্রশিতি জনবল বাড়ানো দরকার। প্রতারণার মধ্যে ই-কমার্স স্ক্যাম, ভিউ বা লাইক দিয়ে আয়ের প্রলোভন, ভুয়া ইনভেস্টমেন্ট বা লোন অ্যাপ, বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে।

পুলিশের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়া ৮৯ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী সামাজিক লজ্জা, ভয় ও পরিবারের চাপে মামলা করে না। আবার যেসব মামলা হয়, তারও ৭২ শতাংশ শেষ পর্যন্ত খারিজ হয়ে যায়। প্রতি পাঁচজন কিশোরী ও তরুণীর মধ্যে তিনজন কোনো না কোনোভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। দেশে গত পাঁচ বছরে সাইবার অপরাধের মোট চার হাজার ৭৯৪টি মামলা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মামলা ডিজিটাল অর্থ লেনদেনে প্রতারণা ও যৌন হয়রানির অভিযোগে।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে ৩ হাজার ৪৬৫টি আর্থিক প্রতারণা-সংক্রান্ত অভিযোগ এসেছে। অনলাইনে পোস্ট, মেসেজ, ছবি ও ভিডিও প্রচার করে হয়রানিসংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া গেছে এক হাজার ৫৮৪টি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হ্যাকের অভিযোগ ৪৯১টি। এর মধ্যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক ২৪৭টি ও ই-মেইল হ্যাক ১০৩টি। জিম্মি ও হুমকিসংক্রান্ত ৪৩৮টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জিম্মির ঘটনা ৩৪৮টি। এ ছাড়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) প্রতারণা ও হ্যাক ২২৮টি। কোনসংক্রান্ত ২১১ অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফেসবুক কোন ১৭৪টি। পর্নোগ্রাফির ৩৯টি অভিযোগের মধ্যে ২৩টি ভুক্তভোগীর আসল ছবি ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনা রয়েছে। অনলাইন জুয়াসংক্রান্ত ৮৩টি, ব্যাংক হিসাব ও কার্ডসংক্রান্ত ৪২টি এবং অন্যান্য বিষয়ে রয়েছে ৪১৫টি অভিযোগ।

ডিএমপির সূত্র জানায়, গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসে ডিএমপির সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে ৯০৫টি সাইবার জিডি জমা পড়েছে। এর মধ্যে টেলিগ্রাম ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা, ফেসবুক জালিয়াতি, সাইবার বুলিং এবং আইডি হ্যাকের অভিযোগ বেশি ছিল। এ সময়ে দু’টি মোবাইল, ১৫টি ফেসবুক ও ৭টি জিমেইল আইডি উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২৭৩ জনকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ডিবির সাইবার ইউনিট ২৯০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে। সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় ১৪ সদস্যের ‘রিকভারি রেঞ্জার টিম’ কাজ করছে।

অনলাইন প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা আইনের জটিলতার ভয়ে পিছিয়ে গেলেও দেশের প্রচলিত আইনে এর কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির আর্থিক তিসাধন করেন, তবে তিনি এই ধারায় অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। তা ছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কোনো ব্যক্তির পরিচয় ধারণ করে বা অন্য কারো ছবি, আইডি বা তথ্য ব্যবহার করে অনলাইনে আর্থিক সুবিধা বা প্রতারণা করেন, তবে তিনি এই ধারায় অপরাধী হবেন। এর শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অপরাধের তুলনায় পুলিশের সাইবার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের প্রযুক্তিগত সমতা এবং জনবলে ঘাটতি রয়েছে। ভুক্তভোগীদের বড় অংশ মনে করেন, খোয়া যাওয়া অর্থের পরিমাণ কম হলে পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে না। কিভাবে অনলাইন প্রতারণার ডিজিটাল প্রমাণ (যেমন- স্ক্রিনশট, ইউআরএল বা ট্রানজেকশন আইডি) সংরণ করতে হয়, তা অনেকেই জানেন না। কোথায় এবং কিভাবে আইনি সাহায্য পাওয়া যাবে, সেই সঠিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভুক্তভোগীদের স্পষ্ট ধারণা থাকে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, আমাদের কাছে যখন কেউ অভিযোগ করলে সাইবার টিম এগুলো নিয়ে তদন্ত করে। এর জন্য ডিএমপির সাইবার সাপোর্ট সেন্টার রয়েছে। তা ছাড়া ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার ও সিটিটিসির সাইবার ইউনিট রয়েছে। এগুলোতে কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ দেয়ার সাথে সাথে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। যে কেউ স্বাচ্ছন্দ্যে অভিযোগ দিতে পারেন। পুলিশ এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে।

পুলিশ সদর দফতর জানায়, ভুক্তভোগীদের প্রতি অনুরোধ, সাইবার জগতে কেউ হয়রানির শিকার হলে অবশ্যই আপনারা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাবেন। অভিযোগ না পেলে পুলিশের পে আইনি ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। যদি নারীরা থানায় অভিযোগ জানাতে না চান তবে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে (পিসিএসডব্লিউ) অভিযোগ জানাবেন। পিসিএসডব্লিউতে ভুক্তভোগী নারীদের সেবায় নারী পুলিশ সদস্যরা সার্বণিক দায়িত্বে রয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কেউ কারো ছবি-ভিডিওর কারসাজি বা কেউ কারো ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে দিলে দ্রুত আইনি পদপে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন পুলিশ।

এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অনলাইনে প্রতারিত হওয়া ব্যক্তিরা অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও পর্যায়ক্রমে অগ্রগতি হবে বলে বিশ^াস করেন না। কারণ আইনি ফলাফল পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তারা এটাকে প্রক্রিয়াগত হয়রানি মনে করেন। সব ধরনের তথ্য দেয়া, বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যাওয়াকে ভুক্তভোগীরা হয়রানি মনে করেন। এতে করে প্রতারিত হওয়ার পরে অভিযোগ করে না। তারা চান, একবার যাওয়ার পরই পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু এটা কখনো সম্ভব হয় না কারণ ঘটনার তদন্ত করতেই অনেক সময় লেগে যায়।

তিনি আরো বলেন, যারা ভিকটিম হচ্ছেন তাদের বড় অংশ হলো নারী। তারা কোনো প্রতারণার শিকার হওয়ার পরও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে আইনের দ্বারস্থ হয় না। সামাজিক মর্যাদা সুরক্ষিত রাখতে চুপ থেকে যায়। দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় এনে ভুক্তভোগীদের সঠিক বিচার পাইয়ে দিতে পারলে সবাই আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। যারা অনলাইনে প্রতারণার শিকার হন সমাজে তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। আইন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে পারলে অভিযোগ দায়ের করতে আগ্রহ বাড়বে। অভিযোগ ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণে অপরাধীরাও অপরাধ করার সুযোগ পাচ্ছে। পুলিশের সব ধরনের আইসিটি কার্যক্রম সম্পর্কে মানুষকে আরো বেশি জানানো প্রয়োজন।