এডিবির জন্য প্রকল্প বিলম্ব গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ

ডেসকোর বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণ

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

  • ঋণচুক্তি করতেই ২১ মাস পার
  • খরচ বাড়ছে ৬৩৬ কোটি টাকা

এখন ৬৩৬ কোটি টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে। শুধু এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে থেকে ঋণ পেতে চুক্তি করতেই ২১ মাস পেরিয়ে যায়। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং কাজের ধীরগতির কারণে এই ব্যয় বাড়ছে। আর প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫১ শতাংশ। অথচ এবছর মার্চেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদেশী অর্থায়নে নেয়া প্রকল্পগুলো অনুমোদনের আগে দাতাদের সাথে চুক্তি কাজ এবং সমীক্ষা সম্পর্কিত কার্যক্রমও সমাপ্ত করা উচিত। তারপর মূল প্রকল্প অনুমোদন নেয়া। তা না হলে কোনো একটি কাজ বিলম্বিত হলে ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মোকাবেলা, বিতরণ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে “ঢাকাস্থ ডেসকো এলাকায় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ” প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যমান উপকেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ ওভারহেড বিতরণ লাইন স্থাপন এবং আধুনিক বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকেই বিভিন্ন জটিলতায় কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, ডেসকো কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ শীর্ষক প্রকল্পটি মোট দুই হাজার ২৭২ কোটি ৪৭ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ব্যয়ে এপ্রিল ২০২২ থেকে মার্চ ২০২৬ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ৫ এপ্রিল ২০২২ তারিখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দেয়। যেখানে জিওবি ৪৪৬.৫০ কোটি টাকা, প্রকল্প সহায়তা (এডিবি) এক হাজার ২৩১.৫৫ কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব ৫৯৪.৪৩ কোটি টাকা অর্থায়ন করা হবে। প্রকল্পের কর্মপরিধির কিছু পরিবর্তন এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ দুই বছর বৃদ্ধি করে প্রকল্পের প্রথম সংশোধনের জন্য ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সংশোধিত ডিপিপিতে মোট ২ হাজার ৯০৮ কোটি ৩৮ লাখ ৪ হাজার টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে জিওবি ৬০৪.০৪ কোটি টাকা, প্রকল্প সহায়তা (এডিবি) এক হাজার ৯৫১ কোটি ১৬ লাখ ৭৩ হাজার টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব ৩৫৩ কোটি ১৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এপ্রিল ২০২২ হতে মার্চ ২০২৮ পর্যন্ত মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল ডিপিপির তুলনায় প্রস্তাবিত প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় মোট ৬৩৫ কোটি ৯০ লাখ ৩১ হাজার টাকা বা ২৭.৯৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রকল্পের অগ্রগতি ৪ বছরে অর্ধেক

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পে ৫৬২ কোটি ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকা বা ২৪.৭৫ শতাংশ খরচ হয়েছে। ওই পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে ভৌত অগ্রগতি ৫১ শতাংশ। সর্বশেষ সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্পের মোট ব্যয় ৬৩৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সাথে প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হচ্ছে যাতে চলমান কাজগুলো সম্পন্ন করা যায়। যদিও এখনো প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ বাকি রয়েছে। বিশেষ করে উপকেন্দ্র নির্মাণ, ট্রান্সমিশন ও বিতরণ অবকাঠামো স্থাপনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

বিলম্ব নিয়ে বক্তব্য

বিলস্ব প্রসঙ্গে ডেস্কোর প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের অর্থায়নের একটি বড় অংশ আসে এডিবি থেকে। কিন্তু ঋণচুক্তি সম্পাদন ও কার্যকর হতে প্রায় ২১ মাস বিলম্ব হয়। ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি এডিবির সাথে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে প্রকল্পের কাজ প্রায় ২১ (একুশ) মাস বিলম্বিত হয়। তারা বলেন, জমির মালিকানা সংক্রান্ত সমস্যার কারণে উত্তরা রূপায়ন সিটির উপকেন্দ্রটি টঙ্গীতে স্থানান্তরিত হবে। চুক্তি মোতাবেক প্যাকেজ জিডি-১ এর অধীনে জমি বিলম্বে হস্তান্তরের কারণে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন। ফলে নির্ধারিত সময়ে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক সময়সূচি ও ব্যয়ের ওপর।

পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রী, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি প্রকল্প ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং সরঞ্জাম সংগ্রহে অতিরিক্ত সময় লাগার বিষয়টিও ব্যয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে প্রকল্পে অনুমোাদিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি দামে চুক্তি করা হয়েছে। যার পরিকল্পনা শৃঙ্খলা পরিপন্থী।

অর্থনীতিবিদ যা বলছেন

উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ কমানো, অর্থায়ন চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দক্ষতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। আর যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের আগেই উচিত হলো অর্থায়নকারী সংস্থা বা ঋণদানকারী সংস্থার সাথে দরকষাকষির কাজ শেষ করা। প্রকল্প অনুমোদনের পরপরই চুক্তি করে ফেরা। তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে এমন জটিলতা ও বাড়তি ভোগান্তিতে কখনোই পড়তে হবে না। তিনি বলেন, মেয়াদ বৃদ্ধির পর অবশিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা। এজন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং সময়মতো অর্থ ছাড় নিশ্চিত করা। বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং করা।