হবিগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই বছরে ঝরে পড়ছে ১৩ হাজার শিশু

কমছে শিক্ষিতের হার বাড়ছে বেকারত্ব

Printed Edition

এম এ মজিদ হবিগঞ্জ

হবিগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর ১৩ হাজারেরও বেশি শিশু শিক্ষার গণ্ডি থেকে ঝরে পড়ছে। গত ১০ বছরে এভাবে এক লাখ ৩০ হাজার শিশুকে শিক্ষার গণ্ডি থেকে বেরিয়া যাওয়ার প্রমাণ মেলে।

হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে ১ম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা ৬৫ হাজার ৮৮৩ জন। একই সময়ে ৯টি উপজেলায় ৫ম শ্রেণীতে অধ্যায়নরত শিশুর সংখ্যা ৫৩ হাজার ৪৫৫ জন। সংখ্যা বিবেচনায় প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়েই প্রতি বছর ১২ হাজার ৪২৮ শিশু স্কুল গণ্ডি থেকে বেরিয়ে গেছে। বাস্তবে এ সংখ্যা আরো বেশি বলে ধারণা করা হয়।

প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া ৬৫ হাজার শিশুর মধ্যে ২য় শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে ৬৪ হাজার, ৩য় শ্রেণীতে তা দাঁড়ায় ৬২ হাজারে, ৪র্থ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে ৫৯ হাজার এবং পঞ্চম শ্রেণীতে গিয়ে ভর্তি হয়েছে ৫৩ হাজার শিশু। হবিগঞ্জে তিন লাখ পাঁচ হাজার শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অধ্যায়ন করছে। তন্মধ্যে ৬৫ হাজার শিশু অধ্যায়ন করছে জেলার বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেনগুলোতে।

পথ শিশু, ভিক্ষুক, অতি দরিদ্র শ্রেণী পরিবারের শিশুদের বিশাল একটি অংশ প্রথম শ্রেণীতেই ভর্তি হয়নি- এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে। ফলে জন্মের পর থেকে কোনো স্কুলে যায়নি এমন অক্ষরজ্ঞানহীন শিশুর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। ভর্তি হয়েও শিক্ষার আলো থেকে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যার সাথে কোনোদিন স্কুলে যায়নি এমন শিশুর সংখ্যা যোগ করা হলে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শিশুর সংখ্যা ভয়াবহ চিত্র ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন হবিগঞ্জের বিশিষ্ট লেখক তাহমিনা বেগম গিনি।

গিনি বলেন, শিশুদের ইনকামের উপর অনেক সময় দরিদ্র মা বাবার খাবারের সংস্থান হয়। দারিদ্রতা এবং কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ও অনেক সময় শিশু শিক্ষার্থীদের স্কুলবিমুখ করছে বলে জানা যায়।

এদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিশুদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দারিদ্রতাকে দায়ী করেন হবিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: শাহ আলম। তিনি বলেন, হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, নবীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার এমনো অনেক এলাকা রয়েছে যেখানে অতি দরিদ্রের সংখ্যা অনেক বেশি। এসব পরিবারের শিশুদের স্কুলে আনা সম্ভব হচ্ছে না। কোনোভাবে যদি কেউ প্রথম শ্রেণীতে ভর্তিও হয়, পরবর্তী বছর দেখা যায় সেই শিশুটি ২য় শ্রেণীতে আর ভর্তি হয়নি বা ঝরে পড়ছে।

শিশুদের স্কুলে ধরে রাখতে বা স্কুলমুখী করতে মিড-ডে মিল বা মধ্যাহ্নভোজ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন সচেতন মহল। হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলার মধ্যে বাহুবল উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে শিশুদের মধ্যাহ্ন খাবার চালু করা হয়েছে। মিড-ডে মিলের মধ্যে রয়েছে ডিম কলা ব্রেড জাতীয় খাবার। এতে করে প্রাথমিকভাবে কিছুটা সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় এই মিড-ডে মিল চালু করা গেলে শিশুদের উপস্থিতি ও স্কুলে স্থায়িত্ব বাড়বে বলে মনে করেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: শাহ আলম।

হবিগঞ্জের হাওর ও চা বাগান এলাকায় শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বর্তমানে সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ডক্টর মোহাম্মদ জহিরুল হক। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, চা বাগান ও হাওর অঞ্চলে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা খুবই উদ্বেগজনক। এটা সার্বিকভাবে হবিগঞ্জ জেলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হাওর ও চা বাগান এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কম থাকায়, নিজস্ব গ্রামের বাসস্থান থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব বেশি থাকাসহ নানা কারণে শিশুরা স্কুল বিমুখ হচ্ছে। অনেক দরিদ্র পরিবার তাদের শিশুদেরকে দ্রুত পরিবারের একজন উপার্জনক্ষম সদস্য হিসেবে দেখতে চান। এ কারণে এ অঞ্চলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ঝরে পড়ছে। শিশু শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ায় শিক্ষার হার দিন দিন কমে যাচ্ছে। সেই সাথে বাড়ছে বেকারত্বের সংখ্যা।

এক তথ্যে জানা গেছে, হবিগঞ্জ জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ২৪৯ জন প্রধান শিক্ষক ও ৪৭৭ জন সহকারী শিক্ষকের পদগুলোও শূন্য রয়েছে। প্রায় জেলায় স্কুল পরিদর্শকের পদ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই খালি পড়ে আছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষকরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না তা যেমন তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না, একই সাথে সাড়ে চার শ’ শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে শিশুদের সঠিক শিক্ষা প্রদান করাও অনেক সময় সম্ভব হয়ে উঠছে না।