নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গাজায় চলমান তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করেছেন খোদ ইসরাইলি সেনারা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-কে দেয়া তিন ইসরাইলি সেনার সাক্ষাৎকার এবং যুদ্ধবিরতি লাইনের বাস্তব চিত্র থেকে জানা যায়, যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়িত হলেও গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড মোটেও থামেনি।
তথ্যমতে, গত অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজা উপত্যকাকে ইসরাইল ও হামাস-নিয়ন্ত্রিত দু’টি অঞ্চলে বিভক্ত করতে একটি সাময়িক সীমানা নির্ধারণ করা হয়, যা ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখা নামে পরিচিত। তবে এই ইয়েলো লাইনের সঠিক অবস্থান অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং বহু এলাকায় এটি সম্পূর্ণ অচিহ্নিত অবস্থায় রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসরাইলি রিজার্ভ সেনারা জানান, যুদ্ধবিরতির নিয়মকানুন নিয়ে মাঠপর্যায়ের সেনাদের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেক কমান্ডার মুখে যুদ্ধবিরতির কথা বললেও ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে উসকানি দিচ্ছেন। একজন সেনা বর্ণনা করেন, কিভাবে তার সহকর্মীরা ইয়েলো লাইনের কাছাকাছি আসা বা তা পার হওয়ার চেষ্টা করা ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালিয়ে আনন্দ ও উল্লাস প্রকাশ করত। কোনো কোনো এলাকায় সেনাদের ওপর স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, ‘যে কেউ লাইন পার হবে, তাকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করো।’ গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ৯০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে একটি বড় অংশ এই ইয়েলো লাইনের কাছাকাছি বা তা পার হওয়ার সময় মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ ও খেলাধুলা করা শিশুও রয়েছে। অনেকসময় সেনারা অনেক দূর থেকে বা অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণে নিশ্চিত না হয়েই লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা চালায়।
সাক্ষাৎকার দেয়া এক সেনা ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে সরাসরি বলেন, ‘গাজায় এখন যা চলছে তাকে যুদ্ধবিরতি বলা একটা রসিকতা মাত্র।’ ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর সংগৃহীত সেনাদের বিভিন্ন জবানবন্দীও এই ভয়াবহ চিত্রকে সমর্থন করে। খোদ ইসরাইলি সেনাদের এই স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা এবং ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ঈদেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত, নিহত অন্তত ৩৩
গাজা উপত্যকায় ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত থাকায় এই সময়ে অন্তত ৩৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়াও হামলায় ১৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও বিভিন্ন এলাকায় বিমান ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় একজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৯৩০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং দুই হাজার ৮১৯ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরো ৭৮১টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গাজায় ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো হাজার হাজার লাশ চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৯৩৯ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন এক লাখ ৭২ হাজার ৯২৭ জন। শনিবার গাজা সিটির ফিরাস মার্কেট এলাকায় বেসামরিক মানুষের ওপর হামলায় দুইজন আহত হন, যাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। একই দিনে দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের কাছে ড্রোন হামলায় জামাল আবু আউন নামে এক ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং একটি শিশুসহ তিনজন আহত হন। এ দিকে খান ইউনুস ও আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের আশপাশেও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও নিয়মিত হামলার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
গাজার ৭০ শতাংশ দখলের ইসরাইলি পরিকল্পনায় ‘উদ্বেগ’
দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত জার্মানি। তবে ২০২৫ সালে গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনা ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা অনুমোদনের পর, গাজায় ব্যবহার করা যেতে পারে এমন সবধরনের সামরিক সরঞ্জাম রফতানি স্থগিত করে বার্লিন। অবরুদ্ধ উপত্যকার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পরও আগ্রাসনের মাত্রা আরো বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। বৃহস্পতিবার অধিকৃত পশ্চিমতীরের একটি অবৈধ ইসরাইলি বসতিতে আয়োজিত কনফারেন্সে তিনি জানান, গাজার নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার জন্য সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে গাজার প্রায় ৬৪ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি বাহিনীর কার্যকর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির তোয়াক্কা না করেই নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর নগ্ন হামলার বার্তা দিলেন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা বর্তমানে হামাসকে চার দিক থেকে চেপে ধরছি। আমরা এখন গাজা উপত্যকার ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছি। প্রথমে ৫০ শতাংশে ছিলাম, এরপর ৬০ শতাংশে এসেছি। আমার নির্দেশ হলো সামনে এগিয়ে যাওয়া। প্রথমত ৭০ শতাংশ; এটা দিয়েই শুরু করা যাক। আমরা সবদিক থেকে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছি।’
এ দিকে গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর চালানো ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে জাতিসঙ্ঘ। ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর পদ্ধতিগত এবং ব্যাপক আকারে যৌন সহিংসতা চালানোর অভিযোগে ইসরাইলকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে সংস্থাটি। জাতিসঙ্ঘের নারী ও শিশুবিষয়ক বিশেষ দূত রিম আলসালেম এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, স্বাধীনভাবে প্রমাণিত ও যাচাইকৃত এই অপরাধের জন্য ইসরাইলকে কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নেয়া উচিত ছিল। জাতিসঙ্ঘের এই কঠোর পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেল আবিব। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের এই সিদ্ধান্তের পর সংস্থাটির সাথে সবধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরাইলি দূত। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, ইসরাইলি ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে বন্দী ফিলিস্তিনিদের ওপর এমন পাশবিক ও পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতন নিয়মিত ঘটনা, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। শুধু জাতিসঙ্ঘই নয়; পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের দায়ে চারটি সংস্থা ও তিন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এই তালিকায় চরমপন্থী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী এবং তাদের সমর্থনকারী সংগঠনগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা
অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের পৃথক হামলায় অন্তত চার ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। হামলায় ঘরবাড়ি, যানবাহন ও কৃষিজমিরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সূত্রগুলো। খবর আনাদোলু এজেন্সির। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানায়, নাবলুসের দক্ষিণে মাদামা শহরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় তিনজন গুলিবিদ্ধ এবং একজন মারাত্মকভাবে প্রহৃত হন। আহতদের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলাকারীরা একটি ফিলিস্তিনি বাড়িতে গুলি চালায়। একই সময়ে নাবলুসের দক্ষিণে বেইতা শহরে একাধিক বাড়িতে পাথর নিক্ষেপ করা হয় এবং কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। বাসিন্দারা প্রতিরোধ গড়ে তুললে ইসরাইলি বাহিনী আকাশে শব্দবোমা নিক্ষেপ করে। অন্য দিকে হেবরনের দক্ষিণে মাসাফের ইয়াত্তা এলাকায় ফিলিস্তিনি কৃষিজমিতে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকটি গাছ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এপ্রিল মাসেই পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ৫৪০টি হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে ছিল শারীরিক নির্যাতন, গাছ উপড়ে ফেলা, কৃষিজমি ধ্বংস, সম্পত্তি দখল এবং ঘরবাড়ি ভাঙচুর। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিমতীরে এক হাজার ১৬৮ ফিলিস্তিনি নিহত, ১২ হাজার ৬৬৬ জন আহত এবং প্রায় ২৩ হাজার মানুষ আটক হয়েছেন।



