আলজাজিরা ও আনাদোলু
- ২ বছর ধরে নিহতের সংখ্যা অস্বীকার করে আসছিল ইসরাইল
- রাফাহ সীমান্ত খুলে দেয়ার অপেক্ষায় ৩০ হাজার ফিলিস্তিনি
গাজায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে- এমন পরিসংখ্যান শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে নিয়েছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। দীর্ঘ সময় ধরে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যকে ‘অতিরঞ্জিত’ ও ‘হামাসের প্রোপাগান্ডা’ বলে উড়িয়ে দিলেও, সম্প্রতি ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা এই সংখ্যার নির্ভুলতা মেনে নিয়েছেন। একে ইসরাইলের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত অস্বীকার ও মিথ্যাচারের রেকর্ডে এক বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
গত বৃহস্পতিবার ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’ ও ‘টাইমস অব ইসরাইল’-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইসরাইলি সেনাবাহিনী এখন বিশ্বাস করে যে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজারের কাছাকাছি, যা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া ৭১,৬৬৭ জনের পরিসংখ্যানের সাথে প্রায় মিলে যায়। এর আগে ইসরাইল এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র বারবার দাবি করেছিল যে, হামাস পরিচালিত এই মন্ত্রণালয়ের তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়। কিন্তু এখন খোদ ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যেও একই চিত্র উঠে এসেছে।
ইসরাইলি সামরিক সূত্র স্বীকার করেছে যে, এই ৭০ হাজার নিহতের মধ্যে বিশাল একটি অংশই বেসামরিক নাগরিক। যদিও আইডিএফ দাবি করছে তারা ২৫ হাজার ‘সন্ত্রাসীকে’ হত্যা করেছে, কিন্তু স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসঙ্ঘ বলছে নিহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এমনকি ইসরাইলি একটি গোপন গোয়েন্দা ডাটাবেসের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের অন্তত ৮৩ শতাংশই ছিল নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এখন এই ‘বেসামরিক ও যোদ্ধা’ অনুপাত নিরূপণের কাজ করছে বলে জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, এই ৭০ হাজার সংখ্যাটিও প্রকৃত নিহতের তুলনায় অনেক কম হতে পারে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা হাজার হাজার নিখোঁজ ব্যক্তি এবং অনাহার ও চিকিৎসাসেবার অভাবে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, পরোক্ষ কারণগুলো বিবেচনায় নিলে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ছয় লাখ ৮০ হাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যার মধ্যে তিন লাখ ৮০ হাজারই হতে পারে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
সীমান্ত খুলে দেয়ার অপেক্ষা
গাজায় ফেরার আশায় মিসরের কায়রোতে অবস্থান করা অন্তত ৩০ হাজার ফিলিস্তিনি রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং ফের খোলার অপেক্ষায় রয়েছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, কায়রোতে ফিলিস্তিনি দূতাবাসে এসব মানুষ নিবন্ধন করেছেন। দূতাবাসের এক কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, সীমান্ত খোলার বিষয়টি এখনো আলোচনাধীন থাকায় নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। এপি আরো জানায়, এক ইসরাইলি কর্মকর্তা বলেছেন, মিসর প্রতিদিন যাত্রীদের নামের তালিকা ইসরাইলকে পাঠাবে, যাতে নিরাপত্তা যাচাই ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। ইসরাইলি সরকারের অধিভুক্ত সংস্থা কো-অর্ডিনেটর অব গভর্নমেন্ট অ্যাক্টিভিটিজ ইন দ্য টেরিটরিজ (সিওজিএটি) বাসের মাধ্যমে যাত্রীদের সীমান্তে আনা-নেয়ার দায়িত্ব পালন করবে।
কর্মকর্তারা জানান, রাফাহ ক্রসিংয়ে সরাসরি কোনো ইসরাইলি সেনা মোতায়েন থাকবে না। তবে গাজায় প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় যাত্রীদের ইসরাইলি নিরাপত্তা তল্লাশির মুখোমুখি হতে হবে। অতীতে এসব তল্লাশি ইসরাইলি সেনা ও মার্কিন বেসরকারি ঠিকাদারদের মাধ্যমে করা হতো। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি বলেন, ‘যে কেউ প্রবেশ বা প্রস্থান করলে তাকে পূর্ণাঙ্গ তল্লাশির আওতায় আসতে হবে।’ সীমান্তটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সহায়তা মিশন ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা পরিচালনা করবেন বলে জানানো হয়েছে।
এ দিকে গাজা প্রশাসনের বরাতে মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, ইসরাইল আরোপিত নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে মিসরের সাথে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং আবারও খোলার সময়সূচি পিছিয়েছে। কমিটির সূত্র বৃহস্পতিবার আশারক নিউজকে জানায়, ক্রসিংটি আগামী সপ্তাহের শুরুতে খোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র জানায়, পিস কাউন্সিলের নির্বাহী পরিষদের কমিশনার জেনারেল নিকোলাই ম্লাদেনভ কায়রোতে গাজা প্রশাসন কমিটির সাথে বৈঠক করেন। সেখানে ইসরাইল পক্ষ থেকে ক্রসিংয়ের ভেতরে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়। ইসরাইল ইতোমধ্যে সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত চেকপয়েন্ট বসিয়েছে, যেখানে নজরদারি ক্যামেরা ও আঙুলের ছাপ স্ক্যানার স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মিসর থেকে গাজায় প্রবেশকারীদের কঠোরভাবে তল্লাশি করা হবে।
যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে হামলা
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজার মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, মধ্য গাজার মাঘাজি শরণার্থী শিবিরের পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় ইয়াসির মুহাম্মদ আবু শাহাদা (২১) ও ওয়ালিদ হাসান দারবিশ (২০) নিহত হন। তাদের লাশ দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানায়, যুদ্ধবিরতির আওতায় যেখান থেকে ইসরাইলি বাহিনী সরে গিয়েছিল, সেই বেসামরিক এলাকাতেই ড্রোন হামলা চালানো হয়। একই সময়ে দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পশ্চিমাঞ্চলে শরণার্থী শিবির লক্ষ্য করে হামলায় বহু ফিলিস্তিনি আহত হন।



