উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা প্রসারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরে কাজ চলছে

Printed Edition
নবনিযুক্ত ও বিদায়ী নৌবাহিনী প্রধানসহ বিমানবাহিনী প্রধান ও সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন  : আইএসপিআর
নবনিযুক্ত ও বিদায়ী নৌবাহিনী প্রধানসহ বিমানবাহিনী প্রধান ও সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন : আইএসপিআর

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশী ও বিদেশী উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ ও ব্যবসা প্রসারের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে কাজ করে যাচ্ছে। গতকাল সকালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এফডিআই সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশে রূপান্তর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমাদের বাজেটে বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা নিশ্চিত করা হয়েছে- যার মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য শক্তি, ওষুধ শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল সেবা, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা এবং লজিস্টিকস। আমরা বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে একটি বৃহৎ উৎপাদন হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছি, আমাদের তৈরী পোশাক শিল্পকে বৈচিত্র্যময় করছি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতায় অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর নির্ভর করে না বরং তা নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর। আমি প্রতিটি ব্যবসায়িক নেতাকে সেই সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের অংশ হতে আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা একসাথে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারি যা হবে সুদৃঢ়, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। আসুন আমরা একসাথে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাই, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করি এবং আগামীর বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলি।

ইনভেস্টমেন্ট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও এক্সপো আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী মূল সম্মেলন শুরুর আগে ইনভেস্টরস এক্সপো পরিদর্শন এবং বিভিন্ন স্টল ঘুরে ঘুরে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর ‘ফিকি এফডিআই কনফারেন্স-২০২৬ : ড্রাইভিং ফরেন ইনভেস্টমেন্ট ফর জবস অ্যান্ড প্রসপারিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আসেন।

অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী, বহুজাতিক কোম্পানির নির্বাহী কর্মকর্তা, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী নেতা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘ফিকি এফডিআই’ রিপোর্ট উন্মোচন করা হয়। এই রিপোর্টে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো শক্তিশালী এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

এফআইসিসিআই আয়োজিত ‘বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক এ সম্মেলন ব্যবসায়ী নেতা, ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য এবং উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন।

এফআইসিসিআইয়ে প্রেসিডেন্ট রুপালী হক চৌধুরী, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট দীপল আবেবিবিক্রমা, এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর টিআইএম নুরুল কবির, প্রাইজ ওয়াটার হাউজ কুপারস বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান, পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ প্রধানমন্ত্রীর হাতে এফডিআই-২০২৬ রিপোর্ট তুলে দেন। পরে রুপালী চৌধুরীর নেতৃত্বে এফআইসিসিআইয়ের পরিচালকরা প্রধানমন্ত্রীকে সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ মানচিত্রখচিত স্মারক দেন।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে তার উপদেষ্টা মাহাদী আমিনের সঞ্চালনায় প্যানালেরি সেশনে ব্যবসা-বণিজ্য-বিনিয়োগে সরকারের নীতি ও অবস্থান তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই বাংলাদেশকে আপনাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের প্রধান গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এই উদ্যোগ নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, আধুনিক প্রযুক্তির প্রবর্তন ঘটিয়েছে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে সমৃদ্ধ করেছে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় অভাবনীয় অবদান রেখে চলেছে। তিনি বলেন, যেকোনো ব্যবসা কেবল উদ্যোক্তার দক্ষতা বা রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সফল হতে পারে না, ব্যবসার সাফল্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করে সরকারের প্রবৃদ্ধি-সহায়ক নীতিমালার ওপর।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উদ্যোক্তা হোন কিংবা বিদেশী বিনিয়োগকারী- আপনি যখন বাংলাদেশে মূলধন বিনিয়োগ করবেন, তখন আমাদের সরকারও তার সময়, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে আপনার পাশে থাকবে। এটি কেবল একটি আশ্বাস নয়, ইনশাআল্লাহ এটি আমাদের সরকারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার। দেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে সত্যি। তবে এর পাশাপাশি আমাদের রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা ও সুদৃঢ় ভিত্তি। আমাদের রয়েছে একটি দ্রুত বিকাশমান বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, একঝাঁক তরুণ ও পরিশ্রমী মানবসম্পদ, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিরঙ্কুশ জনসমর্থনপুষ্ট একটি নির্বাচিত সরকার। এই শক্তিগুলো একত্রিত হয়ে বাংলাদেশকে এক টেকসই ও স্থায়ী সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মভিত্তিক, বিশ্ব অর্থনীতির সাথে যুক্ত এবং বেসরকারি খাতের গতিশীলতায় পরিচালিত অর্থনীতি গড়ে তোলা এই সরকারেরর মূল লক্ষ্য।

সরকারের পাঁচ বছর বয়সে অর্থনীতির সচল করতে কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছিল নির্বাচনের অনেক আগেই। আমরা বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়িক চেম্বার, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং নীতি-নির্ধারকদের কথা গুরুত্বের সাথে শুনেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের কথা গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করেছি, আর তাই এখন আমরা সে অনুযায়ীই কাজ শুরু করেছি। আমরা আইনি ও রেগুলেটরি কাঠামোর আধুনিকায়ন করছি, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার করছি, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা উন্নত করছি, কর ও ভ্যাট প্রশাসনকে সহজ এবং মুনাফা অর্জনের পর তা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে ঝামেলামুক্ত করছি। একই সাথে আমরা একটি গতিশীল পুঁজিবাজার গঠন করছি, স্টার্টআপগুলোকে উৎসাহিত করছি, অপ্রয়োজনীয় বিধিমালা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করছি, প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলো সহজ করছি এবং সরকারি সেবাগুলো ডিজিটালাইজড করছি।

নতুন নৌবাহিনী প্রধানকে র্যাক ব্যাজ পরালেন প্রধানমন্ত্রী

তারেক রহমান এবং বিদায়ী নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধান খোন্দকার মিসবাহ উল আজীমকে ভাইস অ্যাডমিরাল র্যাক ব্যাজ পরিয়ে দিয়েছেন। গতকাল সকালে ঢাকা সেনানিবাসস্থ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে এই র্যাংক ব্যাজ পরানো হয়।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধানকে অভিনন্দন জানান। নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধান বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানান। একই সাথে তিনি, নৌবাহিনীকে আরো আধুনিক, সক্ষম ও সময়োপযোগী বাহিনী হিসেবে এগিয়ে নিতে তার মূল্যবান পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা কামনা করেন। অনুষ্ঠানে, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আইএসপিআর।