বিশেষ সংবাদদাতা
- সংসদ প্রাঙ্গণে ঐতিহাসিক শপথ
- ২৫ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ২৪
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো তারেক রহমানের নেতৃত্বে। দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসজীবন ও রাজনৈতিক নির্বাসন কাটিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তনের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে তিনি দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। তার এই উত্থান বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে একটি নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের কাহিনী হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে অনুষ্ঠিত এক ব্যতিক্রমী ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথের পর পর্যায়ক্রমে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গভবনের প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতা ভেঙে সংসদ প্রাঙ্গণে এই আয়োজন দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
কূটনৈতিক উপস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বার্তা : শপথ অনুষ্ঠানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। চীন, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটানসহ মোট ১৩টি দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভারতের পক্ষে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও উচ্চপদস্থ বেসামরিক-সামরিক কর্মকর্তারা অংশ নেন। এই উপস্থিতি নতুন সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও স্থিতিশীলতার বার্তা বহন করছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
শপথের মুহূর্ত : বিকেল ৩টা ৫৮ মিনিটে সাদা জামা ও গাঢ় কোট-প্যান্ট পরিহিত তারেক রহমান স্ত্রী ডা: জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে সাথে নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করলে উপস্থিত জনতা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। কয়েক মিনিট পর রাষ্ট্রপতির আগমন এবং পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তারেক রহমান। এর পর বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ৪টা ২৮ মিনিটে ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন।
মন্ত্রিসভার বিন্যাস : নতুন মন্ত্রিসভায় দলীয় অভিজ্ঞ নেতা, টেকনোক্র্যাট এবং তরুণ নেতৃত্ব-তিন ধারার সমন্বয় ঘটেছে। অর্থ ও পরিকল্পনা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো ও পরিবেশ-প্রধান খাতগুলোতে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে টেকনোক্র্যাট অন্তর্ভুক্ত করে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সঙ্কট সমাধান এবং প্রশাসনিক সংস্কার- এই পাঁচটি খাতই সরকারের প্রথম বছরের প্রধান অগ্রাধিকার হতে পারে।
সূচনালগ্ন। এখন দেখার বিষয়, এই প্রত্যাশার ভার কতটা সফলভাবে বহন করতে পারে নতুন সরকার।
২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী : শপথ নেয়া ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী হলেন : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়), আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়), সালাহউদ্দিন আহমদ (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়), ইকবাল হাসান মাহমুদ (বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়), হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম (মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়), আবু জাফর মো: জাহিদ হোসেন (মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়), ড. খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়), আবদুল আউয়াল মিন্টু (পরিবেশ, বন, জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ (ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়), মিজানুর রহমান মিনু (ভূমি মন্ত্রণালয়), নিতাই রায় চৌধুরী (সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়), খন্দকার আবদুল মুক্তাদির (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়), আরিফুল হক চৌধুরী (শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়), জহির উদ্দিন স্বপন (তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়), মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ (টেকনোক্র্যাট) (কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়), আফরোজা খানম রিতা (বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়), শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী (পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়), আসাদুল হাবিব দুলু (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাপ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়), মো: আসাদুজ্জামান (আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়), জাকারিয়া তাহের (গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়), দীপেন দেওয়ান (পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়), আ ন ম এহসানুল হক মিলন (শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়), সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বকুল (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়), ফকির মাহবুব আনাম (ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) এবং শেখ রবিউল আলম (সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়)।
২৪ জন প্রতিমন্ত্রী : বিকেল ৪টা ২৮ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন ২৪ প্রতিমন্ত্রীকে শপথ বাক্য পাঠ করান। ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী হলেন : এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত (বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়), অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়), মো: শরীফুল আলম (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়), শামা ওবায়েদ ইসলাম (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়), সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু (কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়), ব্যারিস্টার কায়সার কামাল (ভূমি মন্ত্রণালয়), ফরহাদ হোসেন আজাদ (পানি মন্ত্রণালয়), মো: আমিনুল হক (টেকনোক্র্যাট) (যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়), হাবিবুর রশিদ ও মো: রাজিব আহসান (সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়), মো: আবদুল বারী (জনপ্রশাসন), মীর শাহে আলম (স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়), জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) (অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়), ইশরাক হোসেন (মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়), ফারজানা শারমিন (মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়), শেখ ফরিদুল ইসলাম (পরিবেশ, বন, জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয় ও আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়), নুরুল হক নুর (শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়), ইয়াসের খান চৌধুরী (তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়), এম ইকবাল হোসেন (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়), এম এ মুহিত (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়), আহাম্মদ সোহেল মঞ্জুর (গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়), ববি হাজ্জাজ (শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়) এবং আলী নেওয়াজ মাহমুদ খইয়াম (সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়)।
রাজনৈতিক তাৎপর্য : দক্ষিণ প্লাজায় শপথ অনুষ্ঠান শুধু প্রটোকলের পরিবর্তন নয়, বরং ‘জনতার সরকার’-এর প্রতীকী বার্তা বহন করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। খোলা আকাশের নিচে জনগণের উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার একটি প্রতীকী উপস্থাপন।
তারেক রহমান তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ঐক্য, পুনর্গঠন ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ‘এই সরকার প্রতিশোধের নয়, পুনর্গঠনের সরকার। আমরা আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করব।’
সামনে চ্যালেঞ্জ : তবে পথ সহজ নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সঙ্কট, কর্ম সংস্থানের চাপ, দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা- এসব চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। একই সাথে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও জরুরি।
নতুন প্রত্যাশা : সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের সূচনা দেশের রাজনৈতিক ধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দীর্ঘ সময় পর বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে আসায় সমর্থকদের মধ্যে প্রত্যাশা যেমন উঁচু, তেমনি সমালোচকদের নজরও থাকবে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে।
সংসদ প্রাঙ্গণে নেয়া এই শপথ তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়- বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রে নতুন অধ্যায়ের শুরু। তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন অনেকের কাছে প্রতীকী,কারণ তার বাবা জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়াও একসময় রাষ্ট্রক্ষমতার নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব-দুইয়ের সমন্বয়ে বিএনপির এই সরকারকে অনেকে ‘পরিবর্তনের মিশ্র মডেল’ হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচনী বিজয় থেকে সরকার গঠন : গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জোটসঙ্গীরা আরো তিনটি আসনে বিজয়ী হওয়ায় সরকার গঠনের পথ সুগম হয়। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং তরুণ ভোটারদের সমর্থনই এই বিজয়ের প্রধান ভিত্তি।


