নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে বাজেটে ৩৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হচ্ছে

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জমা দেয়া নবম পে-কমিশনের সুপারিশ পুরোটা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। পে-কমিশনের সুপারিশ বেশ খানিকটা কাটছাঁট করে বর্তমান সরকার গঠিত কমিটি তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথা বলেছে। ফলে পুরো পে-স্কেল তিন অর্থবছরে বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী জুলাই থেকে সরকারের চাকুরেরা নতুন বেসিক বেতনের অর্ধেকটা পাবেন। পরের অর্থবছরে বেসিকের বাকি অর্ধেক দেয়া হবে। এবং পরের অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৮-২০২৯ অর্থবছরে নতুন পে-স্কেলের বিভিন্ন ভাতা দেয়া হবে। অর্থ বিভাগ ও জন প্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition

  • পে-স্কেল পুরোটা বাস্তবায়নে ৩ অর্থবছর লাগবে
  • ১ জুলাই থেকে বর্ধিত বেসিকের ৫০% পাবেন চাকুরেরা

আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকুরেদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত- আধা-সরকারি-বিচার বিভাগ ও বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা আগামী ১ জুলাই থেকে বর্ধিত বেতন পাবেন। তবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জমা দেয়া নবম পে-কমিশনের সুপারিশ পুরোটা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। পে-কমিশনের সুপারিশ বেশ খানিকটা কাটছাঁট করে বর্তমান সরকার গঠিত কমিটি তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথা বলেছে। ফলে পুরো পে-স্কেল তিন অর্থবছরে বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী জুলাই থেকে সরকারের চাকুরেরা নতুন বেসিক বেতনের অর্ধেকটা পাবেন। পরের অর্থবছরে বেসিকের বাকি অর্ধেক দেয়া হবে। এবং পরের অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৮-২০২৯ অর্থবছরে নতুন পে-স্কেলের বিভিন্ন ভাতা দেয়া হবে। অর্থ বিভাগ ও জন প্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

কত টাকা লাগবে, কয় ধাপে বাস্তবায়ন

পে-কমিশনের রিপোর্ট প্রণয়নের সাথে জড়িত এক কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার নয়া দিগন্তকে বলেন, পে-স্কেলের সুপারিশ অনুযায়ী পুরো বেসিক দিতে হলে সরকারের প্রয়োজন হবে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এখন যেহেতু সরকারি চাকুরেরা ১০ শতাংশ মহার্ঘভাতা পাচ্ছেন, তাই নতুন বেতন বাস্তবায়নের সাথে এই ১০ শতাংশ ভাতা সমন্বয় করা হবে। ফলে আমাদের আর ৪৩ হাজার কোটি টাকা দেয়া লাগবে না। এ জন্য প্রয়োজন হবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

তিনি আরো বলেন, এই সপ্তাহে (গত সপ্তাহে) সরকাররে উচ্চ পর্যায় থেকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে গ্রিন সিগন্যাল দেয়া হয়েছে। তাই আমরা আগামী অর্থবছরে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেসিকের অর্ধেকটা (৫০%) আগামী ১ জুলাই থেকে দেয়ার জন্য বাজেটে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছি। বেসিকের বাকি অর্ধেক ২০২৭-২০২৮ অর্থবছরে দেয়া হবে। এর পরের অর্থবছরে দেয়া হবে বিভিন্ন ধরনের ভাতা।

মূল সুপারিশ কাটছাঁট হয়েছে

অন্য এক সূত্র জানায়, অন্তবর্তী সরকারের সময় সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খানের নেত্বতে পে-কমিশনের যে রিপোর্টটি দেয়া হয়েছিল তা বর্তমান সরকার পর্যালোচনা জন্য একটি সচিব কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি অত্যন্ত গোপনে তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে গত সপ্তাহে জমা দিয়েছে। তাদের সুপারিশে জাকির খান কমিশনের সুপারিশ বেশ খানিকটা কাটছাঁট করা হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের ভাতা বাড়ানোর বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে বাদ দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ বর্তমান অবস্থায় রাখার কথা বলা হয়েছে। সচিব এবং তার পদমর্যাদায় বিভিন্নœ ব্যক্তি এখন কুক-মালি-গাড়ির জন্য যে পরিমাণ অর্থ পান তার কোনো পরিবর্তনের পক্ষে সায় দেয়নি সচিব কমিটি। ফলে এই সব উচ্চ পদস্থ সরকারি চাকুরেদের বিভিন্ন ভাতা তেমন একটি বাড়ছে না। জাকির খানের কমিশন উল্লেখ করেছিল পে-কমিশন পুরো বাস্তবায়নের জন্য এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা লাগবে; কিন্তু সচিব কমিটি যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে এ অঙ্ক কমিয়ে ৯০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বর্তমান সরকার গত ২১ এপ্রিল জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এবং সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিশনের সুপারিশ প্রণয়নে গঠিত কমিটি পুনর্গঠন করে সরকার।

প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়। প্রায় ১১ বছর পর নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে পে-কমিশন গঠন করে এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ২১ জানুয়ারি তারা সুপারিশ জমা দেয়।

এই সুপারিশ অনুযায়ী, সরকারি চাকুরেদের সর্বনিম্ন বেতন স্কেল আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে। এতে সর্র্বনিম্ন স্তরে বেতন বাড়বে ১৪২.৪২ শতাংশ এবং এবং সর্বোচ্চ বেতন বাড়বে ১০৫. ১২ শতাংশ। কমিশন তাদের প্রতিবেদনে ২০টি স্কেল তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। আর বর্ধিত এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হলে খরচ পড়বে অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে, বেতন কমিশন সংশ্লিষ্ট মাসিক দুই হাজার টাকা ভাতা প্রদানের সুপারিশ করেছে, শর্ত থাকে যে, সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ দু’জন সন্তান এই সুবিধা পাবে।

এতে আরো বলা হয়েছে, টিফিন ভাতার বর্তমানে প্রচলিত বিধানাবলি অব্যাহত থাকলে, কমিশন ভাতার হার বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বর্তমানে প্রচলিত মাসিক টিফিন ভাতা দু’শ টাকার স্থলে এক হাজার টাকা করা যেতে পারে।

জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পান, এমন পেনশনভোগীদের পেনশন বাড়ছে ১০০ শতাংশের মতো। যারা মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশন পান, তাদের বাড়ছে ৭৫ শতাংশ। আর যারা মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পান, তাদের বাড়ছে ৫৫ শতাংশ।

চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। তবে এটি পুরো মাত্রায় কার্যকর করার জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন বেছে নিতে সুপারিশ করা হয়।