তিন অর্থবছরের জিডিপির আকার প্রক্ষেপণ

আগামী অর্থবছরের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩১.৬০ হাজার কোটি টাকা

তিন অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি-৬.৫%,৭% ও ৭.৫%

Printed Edition

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

আগামী তিন আর্থিক বছরের জন্য জিডিপির হিসাব প্রক্ষেপণ করেছে অর্থমন্ত্রণালয়। এই হিসেবে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আকার প্রক্ষেপণ করা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর পরের অর্থ বছরে (২০২৭-২৮) জিডিপি আকার হবে ৭৬ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এবং পরবর্তী অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে জিডিপির প্রক্ষেপণ করা হয়েছে ৮৬ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিভাগ জিডিপির এই প্রক্ষেপণ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে।

এ দিকে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির আকারও সংশোধন করেছে অর্থবিভাগ। গত বছরের জুনে যখন বাজেট দেয়া হয় তখন চলতি বছরের জিডিপির আকার প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এখন তা সংশোধন করে ৬০ লাখ ৮০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর আওতায় প্রস্তুতকৃত প্রক্ষেপণকে অধিকতর নির্ভরযোগ্য করার জন্য অর্থ বিভাগ নিজেদের মডেলের সাথে বিশ^ব্যাংকের ম্যাক্রো ফিসক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক মডেল (এমএফএমওডি) ব্যবহার করে কয়েক বছর ধরে জিডিপির পূর্বাভাস দেয়ার কাজ শুরু করেছে। বর্তমানে অর্থবিভাগের ব্যবহৃত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো আইএমএফের মডেল অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। অন্য দিকে এমএফএমওডি পূর্বাভাস তৈরি করতে বেশ কিছু আচরণগত সমীকরণ ব্যবহার করে ফলাফল প্রস্তুত করা হয়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেয়ার লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ এখন থেকে এমএফএমওডি ব্যবহার শুরু করেছে।

সূত্র জানায়, অর্থনীতির দুরবস্থা সত্ত্বেও আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। পরবর্তী দুই অর্থবছরে তা বেড়ে হবে যথাক্রমে সাত ও সাড়ে ৭ শতাংশ। অন্য দিকে, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৫ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমবে

এ দিকে, সরকারের পক্ষ থেকে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ ধরা হলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কিন্তু প্রবৃদ্ধি হার কমিয়ে প্রাক্কলন করেছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নিয়ে তিনটি সংস্থার পূর্বাভাষ তিন রকম।

আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) ইকোনমিক আউটলুকের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪.৭ শতাংশ। এর কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধকে মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

অন্য দিকে, বিশ্বব্যাংক তাদের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের কারণে প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.০ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি সঙ্কট ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কিছুটা সতর্ক অবস্থান থেকে প্রবৃদ্ধির এই হিসাবগুলো নির্ধারণ করেছে।

এ দিকে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পিছনে একাধিক কারণকে দায়ী করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ- এসব কারণ মিলেই প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে।

তারা বলেছেন, দেশে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে পরিবারগুলো ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে দুর্বল করেছে। অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত ভোগব্যয় কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি

বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উচ্চ সুদের হার, ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান ও উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়ছে।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং সুশাসনের সঙ্কট দীর্ঘদিনের সমস্যা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক উভয়ই বলছে, আর্থিক খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়াতে ঋণ বিতরণে সতর্ক হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে গেছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিকূলতা

বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের রফতানিখাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

রাজস্ব আদায় ও সংস্কারের ঘাটতি

কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে নিম্নপর্যায়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকার উন্নয়ন ব্যয় ও অবকাঠামো বিনিয়োগে চাপের মুখে পড়ে। একই সাথে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্বও প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। আর এর সব প্রভাব ফেলেছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর।