নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভোটার তালিকার ব্যাপক সংশোধনে ভারতে লাখ লাখ মানুষ ভোটাধিকার হারানোর পর এই আশঙ্কা তীব্র হয়েছে যে হিন্দুত্ব ও নির্বাচনী কারসাজি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রকে নতুন রূপ দিচ্ছে। ভারতের সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনগুলো দেশটির সমসাময়িক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রায় দিয়েছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। ১০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার এই সীমান্ত রাজ্যটি দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করে আসছিল।
বিজেপির বিজয়ের ব্যাপকতা ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রকে বদলে দিলেও এই রায় খোদ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলেছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা এক অভূতপূর্ব ব্যাপক ও অত্যন্ত বিতর্কিত ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর)-এর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে নকল, মৃত বা ‘অযোগ্য’ ভোটারদের বাদ দেয়ার লক্ষ্য থাকলেও এই প্রক্রিয়ার সময় পশ্চিমবঙ্গজুড়ে নব্বই লাখেরও বেশি নাম যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত, বাদ দেয়া বা পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছিল।
ঐতিহাসিকভাবে যেসব জেলায় বিজেপি নির্বাচনীভাবে সংগ্রাম করে আসছে, সেখানে এই প্রক্রিয়াটি অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মুসলিম, পরিযায়ী শ্রমিক এবং দরিদ্র ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল। বিজেপির জয়ী হওয়া অনেক আসনে, বাদ দেয়া বা বিতর্কিত ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর পরিণতি গুরুতর। ভারত হয়তো নির্বাচনী বিকৃতি থেকে গণভোটাধিকার হরণের পর্যায়ে চলে গেছে।
বাংলা কেবল আরেকটি ভারতীয় রাজ্য নয়। ভারত ও পাকিস্তানের সহিংস জন্মকালে, ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভক্ত এই রাজ্যটির বাংলাদেশের সাথে দুই হাজার ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের রাজনৈতিক কল্পনায় একটি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। রাজ্যটির জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম এবং তারা ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির উত্থানকে বাধা দিতে কৌশলগতভাবে ভোট দিয়ে এসেছে।
ঠিক এই কারণেই মোদির কাছে বাংলা এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
বিগত দশকে রাজ্যে বিজেপির দ্রুত বিস্তার ঘটলেও, ২০২১ সালে তারা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়। তাই ২০২৬ সালের নির্বাচনকে এক দিকে যেমন ব্যানার্জীর দুর্বল হয়ে পড়া সরকারের ওপর একটি গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তেমনই অন্য দিকে ভারতীয় নির্বাচন ব্যবস্থা তার একসময়ের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে পেরেছে কি না, তারও একটি পরীক্ষা হয়ে গেল। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এসআইআর প্রক্রিয়া, যা প্রথমে ২০২৫ সালের জুন মাসে বিহারে চালু করা হয় এবং পরে পশ্চিমবঙ্গসহ নয়টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এর বিস্তার ঘটানো হয়।
এই প্রক্রিয়ার অধীনে, বুথ লেভেল অফিসাররা অর্থাৎ ভোটার তালিকা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের যাচাই করতেন। নাগরিকদের অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রামাণ্য দলিলের মাধ্যমে তাদের যোগ্যতা পুনরায় প্রমাণ করতে হতো। ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ভারত সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার গ্রহণ করার পর এই প্রথমবার, ভোটাধিকারের যোগ্যতা প্রমাণের ভার কার্যত নাগরিকদের নিজেদের উপরেই স্থানান্তরিত হলো।
এটি গণতান্ত্রিক চুক্তিতে একটি বিপজ্জনক ফাটল ধরিয়েছিল। এই প্রক্রিয়াটি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর বিশেষভাবে আঘাত হেনেছিল। বিহার এবং বাংলা ভারতের পরিযায়ী শ্রমিকের অন্যতম বৃহত্তম উৎস, যেখানে লাখ লাখ শ্রমিক দূরবর্তী রাজ্যগুলোতে কাজ করে। অনেকেই যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নির্ধারিত সঙ্কীর্ণ সময়ের মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারেননি। অন্যরা নামের বানানে অসামঞ্জস্য, পুরনো নথিপত্রের অনুপস্থিতি, বিয়ের পর পদবির পরিবর্তন বা সরকারি নথিপত্রের মধ্যে গরমিলের মতো সমস্যায় ভুগেছেন।
এই সমস্যাগুলো মুসলিম এবং দরিদ্র মহিলাদের মধ্যে বিশেষভাবে প্রকট ছিল।
ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) জোর দিয়ে বলেছিল যে এই প্রক্রিয়াটি প্রশাসনিক এবং নকল বা জাল নাম বাদ দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয়। বিজেপি এটিকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আসা নথিপত্রহীন মুসলিম অভিবাসীদের নির্মূল করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।
কিন্তু বাংলায়, এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের রূপ নেয়।
যেসব জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি, সেখানে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়ার হার ছিল সর্বোচ্চ। প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতার অভাব ছিল, অন্য দিকে এআই-সহায়তাযুক্ত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ সফটওয়্যারটি উর্দু, বাংলা এবং ইংরেজি বানানের প্রতিবর্ণীকরণের অসামঞ্জস্যতার কারণে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মুসলিম নামগুলোকে চিহ্নিত করেছিল।
টিএমসি বারবার অভিযোগ করেছিল যে, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে কাজ করার চেয়ে শাসক দলের রাজনৈতিক যন্ত্রের সম্প্রসারণ হিসেবেই বেশি কাজ করছিল। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বেশ কয়েকবার হস্তক্ষেপ করলেও শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। ভোটার তালিকা থেকে নিজেদের নাম উধাও হয়ে গেছে জানতে পেরে লাখ লাখ মানুষ আপিল দায়ের করেন। তবুও, ভোটগ্রহণের আগে ৩৪ লাখেরও বেশি আপিল বিচারাধীন ছিল, যার মধ্যে ২,০০০-এরও কম সময়মতো নিষ্পত্তি হয়। আদালত রায় দেন যে, যেসব ভোটারের আপিলের নিষ্পত্তি হয়নি, তারা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না, যদিও তাত্ত্বিকভাবে পরে তাদের নাম পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে।
সেই রায়টি কার্যত ব্যাপক হারে ভোটাধিকার হরণকে বৈধতা দিয়েছিল। বয়স্ক ব্যক্তি, অভিবাসী, অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাগজপত্রসহ নারী এবং দরিদ্র নাগরিকরা এমন এক আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধার সম্মুখীন হয়েছিলেন যা অনেকেই অতিক্রম করতে পারেননি। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছিলেন যে, মুসলিমদের তুলনায় হিন্দু ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ পড়ার ভয় কম ছিল। বাংলার প্রায় ২৭ লাখ ভোটারকে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। ভোটগ্রহণের দিনের আগে আরো লাখ লাখ ভোটার অমীমাংসিত আপিল এবং যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত বিবাদে আটকা পড়েছিলেন।
বিজেপি ২৯,২২৪,৮০৪ ভোট পেয়েছে, যা টিএমসির ২৬,০১৩,৩৭৭ ভোটের চেয়ে ৩,২১১,৪২৭ ভোট বেশি। নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণকারী বিশ্লেষকরা যুক্তি দেখান যে, বিজেপির জেতা অনেক আসনে বাতিল বা বিতর্কিত ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গেছে। সুতরাং, এই যুক্তি দেয়া সঙ্গত যে, নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)সহ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সহায়তায় রায়টি ‘চুরি’ করা হয়েছে বলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, যদিও সাংবিধানিকভাবে এটি একটি নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে কাজ করতে বাধ্য।
বিজেপির এই বিজয়ে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী প্রচারণাও সহায়ক হয়েছিল, যা টিএমসির তথাকথিত ‘মুসলিমপন্থী’ অবস্থানকে ব্যাপকভাবে অতিরঞ্জিত করেছিল এবং হিন্দুদের নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলেছিল। ২০২৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনে বিজেপির ধাক্কার পর, যখন মোদি তার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে জোটসঙ্গীদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন দলটি তার নির্বাচনী কৌশল পুনর্বিন্যাস করতে শুরু করে।
এই প্রচেষ্টার একটি অংশ ছিল প্রস্তাবিত সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়া, যার অধীনে সংসদীয় ও বিধানসভা কেন্দ্রগুলোকে এমনভাবে নতুন করে আঁকা হবে যা উত্তর ও হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর অনুকূলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আসামে, যেখানে বিজেপি এই বছর সহজেই ক্ষমতায় ফিরেছে, সেখানে পূর্ববর্তী সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে মুসলিমদের নির্বাচনী প্রভাবকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
দ্বিতীয় উদ্যোগটি ছিল ভারতজুড়ে এসআইআর প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণ, যার রাজনৈতিক পরিণতি সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে বাংলায় দৃশ্যমান হয়েছিল। তৃতীয়টি হলো ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’-এর উদ্যোগ, যা সমস্ত রাজ্য ও জাতীয় নির্বাচনকে একযোগে করার একটি প্রকল্প। প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে উপস্থাপিত এই প্রস্তাবটি মোদির চারপাশে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে আরো কেন্দ্রীভূত করবে এবং বিজেপির জাতীয় যন্ত্রকে প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলোর ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেবে।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনাগুলো ভারতীয় গণতন্ত্রের কাঠামোকে স্থায়ীভাবে নতুন রূপ দেয়ার একটি প্রচেষ্টার দিকে ইঙ্গিত করে। ভারতের বেশিরভাগ অংশ, যা এখন বিজেপির শাসনাধীন, দলটির হিন্দু সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ হিন্দুত্বের কবলে রয়েছে। নির্বাচনী ও গণতান্ত্রিক অখণ্ডতার অবক্ষয়ের পাশাপাশি, ভারত সম্পর্কে বর্তমান ধারণা ও ভাবমূর্তি বিলুপ্তির পথে এবং তার পরিবর্তে একটি চরম স্বৈরাচারী ও হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে।



