দেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংকিং সেবার প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ ও আস্থা ক্রমাগত বাড়ছে। এই বাস্তবতায় ট্রাস্ট ব্যাংকও ধাপে ধাপে তাদের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিং সেবা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, গ্রাহক আস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান জামান চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নয়া দিগন্তের সিটি এডিটর আশরাফুল ইসলাম।
প্রশ্ন : ইসলামী ব্যাংকিং ইউনিট চালুর পেছনে মূল ভাবনা কী ছিল?
আহসান জামান চৌধুরী : ট্রাস্ট ব্যাংক শুরু থেকেই একটি পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সামনে রেখে ২০০৮ সালে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করে। দেশের বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিং সেবার যে চাহিদা রয়েছে, সেটিকে গুরুত্ব দিয়েই এই উদ্যোগ নেয়া হয়। একই সাথে নতুন গ্রাহক আকর্ষণ এবং বিদ্যমান গ্রাহকদের ধরে রাখাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকিং সেবা চালু থাকায় গ্রাহকদের জন্য পণ্য ও সেবার বৈচিত্র্য বেড়েছে। ফলে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী শরিয়াহসম্মত আর্থিক সমাধান গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি ব্যাংকের আয়ের উৎসও বহুমুখী হয়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
প্রশ্ন: বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকিং ইউনিটের আমানত ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি কেমন?
আহসান জামান চৌধুরী : বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকার নীতি অনুসরণ করছি। এ কারণে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কিছুটা সীমিত থাকলেও আমানতে ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র ইসলামী ব্যাংকিং খাতেই গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ ইতোমধ্যে ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত বছরের তুলনায় যা প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এটি ইসলামী ব্যাংকিং সেবার প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতারই প্রতিফলন।
প্রশ্ন: শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে কী ধরনের কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে?
আহসান জামান চৌধুরী : ট্রাস্ট ব্যাংকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি রয়েছে। এই কমিটিতে দেশের খ্যাতনামা শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ, ইসলামী অর্থনীতি ও ফিকহবিদরা যুক্ত আছেন। তাদের তত্ত্বাবধানে একটি পৃথক শরিয়াহ সেক্রেটারিয়েট কাজ করে। ব্যাংকের সব পণ্য, সেবা ও কার্যক্রম শরিয়াহ বোর্ডের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কমিটি নিয়মিতভাবে লেনদেন, বিনিয়োগ ও অপারেশন পর্যালোচনা করে। পাশাপাশি শরিয়াহ অডিট রিপোর্ট বিশ্লেষণ, ফতোয়া ও গাইডলাইন প্রদান এবং কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার কাজও করে থাকে।
প্রশ্ন: একই প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত ও ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনায় কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
আহসান জামান চৌধুরী : একই প্রতিষ্ঠানে দুই ধরনের ব্যাংকিং পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু অন্তর্নিহিত ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে ফান্ড মিশে যাওয়ার ঝুঁকি, জটিল প্রোডাক্ট স্ট্রাকচার এবং গ্রাহকের আস্থার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া পৃথক হিসাব ব্যবস্থাপনা ও আলাদা আইটি সিস্টেম পরিচালনার প্রয়োজন হয়, যা পরিচালন ব্যয় বাড়ায়। দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতিও বর্তমানে একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা শুরু থেকেই আলাদা আইটি সিস্টেমের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছি। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের তহবিলও সম্পূর্ণ পৃথকভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এতে শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স আরো শক্তিশালী হয়েছে।
প্রশ্ন: গ্রাহকের আস্থা অর্জনে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে?
আহসান জামান চৌধুরী : আমরা শুরু থেকেই গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন এবং শরিয়াহসম্মত সেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছি। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। শক্তিশালী শরিয়াহ গভর্ন্যান্স কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। শরিয়াহ সেক্রেটারিয়েট প্রতিদিনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এবং শরিয়াহ বোর্ডকে সহায়তা করে। এর ফলে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা নতুন গ্রাহক আকর্ষণের পাশাপাশি বিদ্যমান গ্রাহকদের আস্থাও বাড়িয়েছে।
প্রশ্ন: ইসলামী ব্যাংকিং সেবায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?
আহসান জামান চৌধুরী : বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংকিং ছাড়া আধুনিক ব্যাংকিং কল্পনা করা যায় না। ট্রাস্ট ব্যাংকও গ্রাহকদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের জনপ্রিয় মোবাইল অ্যাপ “ট্রাস্ট মানি অ্যাপ” গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিং সেবা সহজ করেছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে হিসাব তথ্য দেখা, নতুন হিসাব খোলা, ফান্ড ট্রান্সফার, বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করা যাচ্ছে। এ ছাড়া এটিএম, সিআরএম, স্মার্ট পয়েন্ট ও স্মার্ট আইভিআর-এর মতো প্রযুক্তিনির্ভর সেবাও চালু রয়েছে। নিয়মিত নতুন ফিচার সংযোজনের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবাকে আরও উন্নত করা হচ্ছে।
প্রশ্ন: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ইসলামী অর্থায়নে কী ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে?
আহসান জামান চৌধুরী : সীমিত পরিসরে হলেও ইসলামী এনজিওর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলবে বলে আমরা আশা করছি। তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা স্থিতিশীল ও লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগে। তাই এই খাতের পূর্ণ সুফল পেতে আরও কিছু সময় প্রয়োজন হবে।
প্রশ্ন: দেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা কীভাবে দেখছেন?
আহসান জামান চৌধুরী : বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি অনেক প্রচলিত ব্যাংকও ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো চালু করেছে। ফলে গ্রাহকদের জন্য বিকল্প বেড়েছে এবং সেবার মানোন্নয়নের চাপও তৈরি হয়েছে। আমরা সরাসরি প্রতিযোগিতার চেয়ে নির্দিষ্ট গ্রাহকগোষ্ঠীর প্রয়োজন অনুযায়ী শরিয়াহসম্মত পণ্য ও সেবা দেওয়ার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন, সহজলভ্য সেবা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে ইসলামী ব্যাংকিং ইউনিটকে আলাদা সাবসিডিয়ারি বা পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকে রূপান্তরের পরিকল্পনা আছে কি?
আহসান জামান চৌধুরী : ইসলামী ব্যাংকিং সেবার প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই খাতে আরও বিস্তৃতভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
আমরা ধাপে ধাপে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি। এ জন্য নতুন শরিয়াহসম্মত পণ্য ও সেবা চালু, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে এসএমই, নারী উদ্যোক্তা এবং রিটেইল গ্রাহকদের জন্য নতুন পণ্য উন্নয়নের কাজ চলছে।
প্রশ্ন: আগামী পাঁচ বছরে এই ইউনিটকে কোথায় দেখতে চান?
আহসান জামান চৌধুরী : আগামী পাঁচ বছরে আমরা ট্রাস্ট ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং ইউনিটকে একটি শক্তিশালী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং গ্রাহককেন্দ্রিক পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হবে সেবার পরিধি বাড়ানো, ডিজিটাল ব্যবহারের হার বৃদ্ধি, ইসলামী অর্থায়নের পোর্টফোলিও সম্প্রসারণ এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স, নতুন উদ্ভাবনী পণ্য চালু এবং টেকসই প্রবৃদ্ধিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিং ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।



