রফিুকল হায়দার ফরহাদ চর পাঙ্গাইশসা, ভোলা থেকে ফিরে
আগের দিন হোসেন মাঝির ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় আমাদের আর যাওয়া হয়নি চর পাঙ্গাইশসায়। ট্রলার মাঝি তখন বলেছিলেন, বিকেলে গেলে আর লাভ হবে না। কারণ জোয়ারে ভরে যাবে ওই চর।’ অবশ্য তার পক্ষে আর বিকেলে ট্রলার সচল বা খালি ট্রলার জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। অন্য দিকে আমি নাছোড় বান্দা, চর পাঙ্গাইশসায় যাবই। তাই তখনই আরেক মাঝিকে রাজি করালেন পরদিন সকালে যেন আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় ওই চরে। যেহেতু আমি বেলা ১টার খেয়া ধরে চর কুকরি মুকরি ঘাট থেকে চরফ্যাসনের বেতুয়া লঞ্চ ঘাটের উদ্দেশে রওনা হবো। তাই আমাকে বলা হলো ভোরে যেন চর পাঙ্গাইশসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকি। সকাল সাড়ে ৭টায় এসে হাজির উঠতি আরেক মাঝি। এরই মধ্যে এসে গেলেন হোসেন মাঝিও। তিনি এসে বললেন, তার ট্রলারের ইঞ্জিন ঠিক হয়ে গেছে। ফলে আমি তাকে নিয়েই রওনা হলাম চর পাঙ্গাইশসার উদ্দেশ্যে। অন্য মাঝি বাদ।
তবে ট্রলার ছাড়ার আগে বললেন, ১১টার পরে ভাটা শুরু হবে সাগরে। তখন পানি থাকবে না চর পাঙ্গাইশসায়। এর আগে গেলে জোয়ারের পানিতে ভরা থাকবে চর। তবে আমার পক্ষে ততক্ষণ পর্যন্ত গভীর সাগরে থাকার সুযোগ নেই। তাহলে ঢাকাগামী লঞ্চ মিস করব। তাই জোয়ারের সময় ডুবে থাকা চরটিকে দেখতে বের হলাম।
এই চর পাঙ্গাইশসায় খুব সকালে যাওয়ার জন্যই আমি রাতে আমি কুকরি মুকরির নারিকেল বাগানের পাশেই তাঁবুতে ছিলাম। পাশে চরফ্যাসনের আরো পাঁচজন উঠতি পর্যটক। তারা কলেজে পড়ে। রাতে তারা মুরগির বারবিকিউ করেছিল। আমাকেও দিয়েছিল। যদিও আমি এর আগেই রাতের খাবার শেষ করে ফেলি। অবশ্য তাদের সেই খাবার তাঁবুর মধ্যে রেখে দেই সকালে খাওয়ার জন্য। সতর্ক ছিলাম রাতে শিয়াল যেন হানা না দেয় এই খাবার খেতে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শিয়ালের এমন অভ্যাস আছে। রাতে সে রান্না করা খাবারের গন্ধ পেলে তাঁবুতে হামলা চালায়। অবশ্য আমাদের তাঁবুর পাশে একটি কুকুর ছিল। তাকে খাবার দেয়া হয়েছিল শিয়াল তাড়ানোর জন্য। হয়তো সে কারণেই রাতে শিয়ালের আক্রমণ থেকে রক্ষা। তাঁবুতে থাকা পর্যটকরা এভাবেই কুকুরকে খাবার দেয় শিয়াল তাড়ানোর জন্য।
সকালে সেই বারবিকিউ এবং পরোটা নারিকেল বাগানের হোটেলে গরম করে ট্রলারে উঠলাম। ওই পাঁচ কলেজছাত্রকেও বললাম আমার সঙ্গী হওয়ার জন্য। এদের তিনজন রাজি ছিল। একজন দোমনা। তবে ফাজিল কিসিমের অপরজনের জন্য এদের যাওয়া হলো না আমার সাথে।
সাড়ে ৮টার সময় কুকরি মুকরির ঘাট থেকে আমরা রওনা হয়ে কালির চর ও চর জমিনকে পেছনে ফেলে ছুটলাম দক্ষিণ দিকে। এবার ট্রলারে আমি আর হোসেন মাঝি। রাতুল আসেনি। সে অন্য কাজে ব্যস্ত। নারিকেল বাগানে থাকা আরেক গ্রুপ পর্যটককে সেবা দিতে হবে রাশেদের। তার বড় ভাই রাসেল ঢাকা যাবে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে। তাই রাশেদ হাওলাদারও আর আমার সাথে গেল না পাঙ্গাইশসার চরে।
রওয়ানা হওয়ার ঘণ্টা খানেক পর আমরা পৌঁছালাম চর পাঙ্গাইশসায়। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল সাগরে পোঁতা বেশ কিছু গাছের ডাল। হোসেন মাঝি বললেন, ‘ওই ডাল পোঁতা এলাকাই পাঙ্গাইশসার চর। ডালে বাঁধা ইলিশের জাল।’ ধীরে ধীরে আমাদের ট্রলার পৌঁছল সেই জালের কাছে। তবে ট্রলারের গুঁতা লেগে যাতে জাল ছিঁড়ে না যায় সে দিকে গভীর নজর হোসেন মাঝির। লাখ লাখ টাকার এই জাল ছেঁড়া নিয়ে জেলেদের মধ্যে রক্তারক্তি হয় গভীর সাগরে।
ঠিক তখনই হোসেন মাঝি চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনার ভাগ্য খুবই ভালো। এই যে দেখুন পানির নিচে একটি ইলিশ মাছ জাল আটকা পড়েছে। আটকা পড়ে ছোটার চেষ্টা করছে।’ আমিও ছবি তোলা, ভিডিও করা- সব কাজই করলাম। এরপর বললেন, ‘ভাটা শুরু হতে আরো দুই ঘণ্টা লাগবে। ইচ্ছে করলে আমি সেই ভাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারব। তখন পানি নেমে যাওয়া চরে নামতে পারব।’ আমার হাতে সময় নেই। তাই তার প্রস্তাবে রাজি হতে পারিনি। আমরা যখন জালে আটকা জ্যান্ত ইলিশ মাছের ভিডিও করছিলাম তখন কিন্তু জালটি পাতা কোনো জেলেকেই দেখছিলাম না। দূরে একটি ট্রলার দেখতে পাচ্ছিলাম। নিশ্চিত এই জালের জেলেরা সাগরের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে জাল পেতে এখন ট্রলারে বিশ্রাম নিচ্ছে। ভাটার আগে আগে জাল তুলবে। এই সব ডুবো চরে ভাটার সময় জাল পেতে রাখা হয় জোয়ারের সময় আসা মাছ আটকানোর জন্য। পরে সেই জাল তুলে মাছ ধরা। কেন এই চরের নাম দেয়া হলো পাঙ্গাইশসার চর। হোসেন মাঝি জানান, ‘এক সময় এই চর এলাকায় সাগরের পাঙ্গাশ মাছ পাওয়া গিয়েছিল। তাই এই চরের নাম দেয়া হয় পাঙ্গাইশসার চর।’ আলী মাঝি জানান, ‘এই চরের এলাকায় পাঙ্গাশ মাছ ছাড়াও কোরাল, তুলার ডান্ডি, পোয়াসহ নানা জাতের মাছ পাওয়া যায়। আর ইলিশ মাছতো মিলবেই।’
হোসেন মাঝি বারবারই বলছিলেন, আমার জন্য ইলিশ মাছটি জাল থেকে ছাড়াবেন কিনা। খাওয়ার জন্য এই প্রস্তাব। আমি রাজি হয়নি। প্রথমত. মাছ তথা জালের মালিক ধারে কাছে নেই। দ্বিতীয়ত. রান্না করার চুলা আনা হয়নি। যে কারণে মাছের প্রতি কোনো আগ্রহই ছিল না। আর যেহেতু কোমর পরিমাণ জোয়ারের পানি পাঙ্গাইশসার চরে তাই পানি-জাল ও জালে আটকা ইলিশ মাছ ছাড়া আর কিছুই দেখার ছিল না চরে। হোসেন মাঝি এই কোমর পানিতে আমাকে নামতে অনুরোধ করলেন। আমার কাছ থেকে না সূচক উত্তর। স্রেফই জোয়ারের সময় ডুবো চরের পানিতে ঢেকে যাওয়ার দৃশ্য দেখতেই এখানে আসা।
জাকির মাঝি জানালেন, এই চরে আগে গাছপালা ছিল। পরে সব গাছই মরে গেছে। আলী মাঝি তথ্য দিলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই পাঙ্গাইশসার চর দেখে আসছি। ধরেন ৩০ বছর আগে এই চর জেগে উঠে। ১৪-১৫ বছর আগে এখানে পানিতে ভেসে থাকা বনের গাছের বীজ গিয়ে ঠেকতে থাকে এই চরে। এরপর কেওড়া, গেওয়াসহ নানান জাতের গাছ জন্মায়। তবে বেশি দিন এই গাছ বাঁচেনি। গাছগুলো দুই-তিন হাত পর্যন্ত লম্বা হয়েছিল। সাথে বিভিন্ন লতা গুল্ম। তখন এই চর জোয়ারের পানিতে ডুবত না, জেগেই থাকত। তবে এর কয়েক বছর তলিয়ে যায় এই পাঙ্গাইশসার চর। ফলে চরের সব গাছই মরে গেছে; ঠিক শিপ চরের মতো।’ হোসেন মাঝি জানান, ধানী বন মানে যে বনের ঘাস গরু-মহিষে খায় এমন ঘাস ছিল এই চরে। আগে জোয়ারের সময় চরের মাঝ খানের কিছু অংশ জাগনা থাকত (পানিতে ডুবত না)। তবে ৮-১০ বছর আগে এক ঝড়ে সেই বন তলিয়ে যায়। পুরো পাঙ্গাইশসার চরও এর পর থেকে ভাটায় ভেসে উঠছে আর জোয়ারে ডুবে যাচ্ছে।


