রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় বিরোধীদের ব্যাপক বিক্ষোভ-ওয়াকআউট

Printed Edition
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেয়ায় ওয়াকআউটের আগে প্রতিবাদ জানান বিরোধী দলীয় এমপিরা : নয়া দিগন্ত
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেয়ায় ওয়াকআউটের আগে প্রতিবাদ জানান বিরোধী দলীয় এমপিরা : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের ভাষণের সময় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। এর আগে প্লাকার্ড হাতে নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন তারা। এ সময় বিভিন্ন স্লোগানও দেন সংসদ সদস্যরা। পরে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান জানান, তিন কারণে তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছেন। আর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ২৪-এর জুলাই আন্দোলনের ফসল এই সংসদে কোনো ফ্যাসিস্ট বক্তব্য রাখতে পারেন না।

অধিবেশনের বিধি অনুযায়ী গতকাল বিকেল ৩টা ৩৩ মিনিটে রাষ্ট্রপতির আগমনের বার্তা ঘোষণা করেন স্পিকার মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সাথে সাথে বিক্ষোভ শুরু করেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। বিােভের মধ্যেই বিউগলের সুর বেজে ওঠে এবং অধিবেশন কে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন। তিনি স্পিকারের ডান পাশে রাখা নির্ধারিত আসনের সামনে দাঁড়ান। এ সময় জাতীয় সঙ্গীত বেজে ওঠে এবং অধিবেশন করে মনিটরে জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হয়। সরকারদলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান। জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিরোধী সদস্যরাও দাঁড়িয়ে যান। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন শেষ হলে রাষ্ট্রপতি নির্ধারিত আসনে বসেন। অন্য দিকে অধিবেশন করে ভেতর আসনে দাঁড়িয়ে প্লাকার্ড হাতে বিােভ প্রদর্শন করতে থাকেন জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডগুলোতে লেখা ছিল- ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’, ‘গণতন্ত্র চাই, ফ্যাসিজম নয়’ এবং ‘জুলাইয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ করো’ ইত্যাদি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বারবার শান্ত থাকার অনুরোধ জানালেও বিরোধী দলের সদস্যরা স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে আসন ছেড়ে সামনে এসে বিক্ষোভ করতে থাকেন তারা। রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে ‘খুনি’, ‘কিলার চুপ্পু’, ‘ফ্যাসিস্ট চুপ্পু’, ‘গেট আউট চুপ্পু’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এতে কয়েক মিনিটের জন্য অধিবেশন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই ৩টা ৩৬ মিনিটে রাষ্ট্রপতি তার লিখিত ভাষণ দিতে ডায়াসের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

এ সময় বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো: তাহের, চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও হাসনাত আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে বিরোধী সদস্যরা স্লোগান দিতে থাকেন। তারা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ-গণতন্ত্র একসাথে চলবে না’, ‘ফ্যাসিবাদের দোসররা, হুশিয়ার সাবধান’। বিােভের সময় বিরোধী সদস্যরা টেবিল চাপড়াতে থাকেন এবং উচ্চস্বরে চিৎকার করতে থাকেন। এতে অধিবেশন কে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই হট্টগোলের মধ্যেই বিএনপির কয়েকজন এমপি বিরোধী সদস্যদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, আপনারা কাজটি ঠিক করছেন না। রাষ্ট্রপতি অর্ধেক মানছেন, অর্ধেক মানছেন না তাকে অসম্মান করছেন। তবে অধিকাংশ সরকারদলীয় সদস্যকে এ সময় চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যায়।

বিােভ চলাকালে মাইক ছাড়াই বিরোধী দলের প থেকে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট, পদত্যাগ এবং গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়। এ সময় বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান মাইক ছাড়াই বক্তব্য দিয়ে বলেন, এই রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের সহযোগী, দালাল। এই সংসদে আমরা তার ভাষণ মেনে নিতে পারি না। এ পর্যায়ে বিরোধী জোটের সদস্য এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজের আসন ছেড়ে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ডায়াসের দিকে তেড়ে যান। তবে তাকে থামিয়ে দেন বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা: আব্দুল্লাহ মো: তাহের ও চিপ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তারা দুই হাত প্রসারিত করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন এবং পরে ৩টা ৪৯ মিনিটে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি ও ভাষণের প্রতিবাদ জানিয়ে তারা সংসদ ক থেকে ওয়াকআউট করেন।

একপর্যায়ে স্লোগান দিতে দিতে বিরোধী দলীয় সদস্যরা অধিবেশন ক থেকে বেরিয়ে যান। প্রায় চার মিনিট ধরে চলা এই অচলাবস্থার পর রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ শুরু করেন। এ দিকে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদের বাইরে এসে গেটে সাংবাদিকদের কাছে পরিস্থিতি ব্রিফ করেন। এ সময় বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এই সংসদ জুলাই শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ছিল তারা যেন এখানে কোনো বক্তব্য রাখতে না পারে। রাষ্ট্রপতি তিনটি কারণে অপরাধী, তার বক্তব্য আমরা এই মহান সংসদে শুনতে পারি না মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্রথমত তিনি অতীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেননি। রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে তিনি সেই সময়ের কোনো খুনের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করেননি এবং কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।

দ্বিতীয় অভিযোগ হিসেবে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেয়া সাাৎকারে তিনি সেই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন। এতে তিনি জাতির সামনে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। কোনো মিথ্যাবাদী দেশের রাষ্ট্রপতি থাকতে পারে না।

তৃতীয় অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংস্কার পরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য এই দুই ভূমিকায় দায়িত্ব পালনের বিষয়টি একটি অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা থাকলেও রাষ্ট্রপতি তা করেননি। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেও সেই অনুযায়ী উদ্যোগ না নেয়ায় রাষ্ট্রপতি জনগণকে অসম্মান করেছেন। এসব কারণেই তারা রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনতে রাজি নন বলে জানান তিনি। একই সাথে সরকারি দলকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হলেও তাদের সেই আহ্বান গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সংক্ষুব্ধ হয়ে সংসদ থেকে বের হয়ে এসেছি। ভবিষ্যতেও সংসদে কোনো অন্যায় হলে আমরা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবো এবং জনগণের অধিকার রায় লড়াই চালিয়ে যাবো।

স্পিকারের কাছে নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রত্যাশা : এর আগে প্রথম অধিবেশনের শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্পিকারকে উদ্দেশ করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আপনার কাছে সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাদা কিছু হবে না-এমনটাই আমরা আশা করি। আপনার কাছে সুবিচার পাবো। জাতির কল্যাণে আমরা যে কথাগুলো বলতে চাই, তা বলার সুযোগ পাবো। আপনার নেতৃত্বে এটি একটি গতিশীল সংসদ হবে আমরা এটা আশা করতে চাই। আমরা আশা করতে চাই অতীতে যে মন্দ নজির সৃষ্টি হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে এটি নতুন করে আর হবে না। আজকের এই সংসদে অনেক নতুন তরুণ সদস্য এসেছেন। বয়সে একটু বেশি হলেও আমিও তরুণ। আমার জীবনে এটা প্রথম সংসদ। সুতরাং আমিও তরুণদের একজন। ডা: শফিকুর রহমান বলেন, অতীতের সংসদগুলোতে দেশের মানুষের কল্যাণের বিষয় নিয়ে আলোচনা কম হয়েছে। বরং অনেক সময় ব্যয় হয়েছে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও চরিত্রহননে। এই সংসদ যেন আর কারো চরিত্রহননের কেন্দ্রে পরিণত না হয়। আপনার কাছ থেকে এ ব্যাপারে কেউ যেন সামান্যতম সুযোগও না পায়। বক্তব্যের শেষে স্পিকারের কাছে আবারো ন্যায়বিচার চেয়ে জামায়াত আমির বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন সময় অসংখ্য মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, অনেকে জীবন দিয়েছেন, গুমের শিকার হয়েছে। জুলাইয়ে একটা স্লোগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, আমি এখনো সেই স্লোগান দিতে চাই ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।

সংসদের সভাপতি নির্বাচনে সমর্থন না চাওয়ায় জামায়াতের অসন্তোষ : আইন অনুযায়ী সাবেক স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার পদে কেউ না থাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদের সভাপতি হিসেবে সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন। পরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার দল বিএনপির এমপিদের প থেকে সমর্থন করে বক্তব্য দেন। এতেই ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার জন্য উঠে পড়েন। তখন জামায়াত এমপি ও বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন এবং ফোর নিয়ে বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতি হিসেবে সমর্থন করেন। তবে এ বিষয়ে বিরোধী দলের সমর্থন না চাওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন। ডা: তাহের বলেন, তার প্রতি আমাদের সমর্থন রয়েছে, তবে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের কাছে সমর্থন কামনা করতেন তাহলে তা ভালো হতো। আশা করি আগামীতে এর ব্যত্যয় হবে না।

স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনে ভোট দেয়নি বিরোধীরা : জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে ভোট দেয়নি প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী-এনসিপিসহ বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় সংসদের সভাপতি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ভোট পরিচালনা করেন। সংসদে স্পিকার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমকে সরকারি দল বিএনপির প থেকে একক প্রার্থী করা হয়। ভোটে হ্যাঁ-না ভোট আহ্বান করলে বিএনপির এমপিরা হ্যাঁ এর পে ভোট দেন। জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলের এমপিরা এ সময় নীরব থাকেন। সংসদ সভাপতি না ভোটের আহ্বান করলে তখন জামায়াত জোটের এমপিরা নীরব থাকেন। পরে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। পরে অবশ্য নির্বাচিত হয়ে গেলে টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান জামায়াত জোটের এমপিরা। একইভাবে ডেপুটি স্পিকার পদে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিএনপির একক প্রার্থী ছিলেন। বিএনপির এমপিরা ‘হ্যাঁ’ এর পে ভোট দিলেও জামায়াত জোটের এমপিরা হ্যাঁ-না কোনো ভোটই দেননি।